বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী বাঁশকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হোক!

Arshad Aliএরশাদুল বারী: আদিকাল থেকেই পৃথিবীতে বিশেষ করে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে বাঁশের (ইংরেজি পরিভাষা Bamboo) ব্যবহারের কোন জুড়ি নেই। খাঁচা-মাচা ও দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্য তৈরী থেকে শুরু করে আমাদের সবকিছুতেই যেন বাঁশের ব্যবহার অপরিহার্য। ছোটকালে (কৈশরে) গণিতে ঐকিক নিয়মের অংক কষতে গিয়ে শিখেছি কিভাবে বানর তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে উঠে আর নামে। বিবেকহীন গরুর দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাখালকে দেখেছি বাঁশের কঞ্চির ব্যবহার করতে। বড়শীর (মাছ ধরার এক প্রকারের যন্ত্র বিশেষ) বদলে বাঁশের বিশেষ অংশের ব্যবহার করে কই মাছ ধরতে দেখেছি জেলেকে (আমাদের চলনবিল এলাকায় হয়)। বাঁশের তৈরী লগি-বৈঠা দিয়েই মাঝিকে দেখেছি তার নৌকাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গ্রাম-গঞ্জে বাঁশের লাঠির ব্যবহার দেখেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া বড় মুশকিলই বটে। এই বাঁশের তৈরী লগি-বৈঠা দিয়েই রাজপথে বিরোধীদের ঘায়েল করতে (২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর) দেখা গেছে, এমনকি সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ হত্যা করতেও। এই বাঁশ দিয়েই বাপ-দাদাদেরকে বানাতে দেখেছি দাঁতখিলানী (খাবার পরে দাঁতের ময়লা বের করার বিশেষ যন্ত্র) হিসেবে। আবার বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে (ভারত বিরোধী) ক্রিকেট খেলায় ভারতকে হারালে ধনী-কোহলীদের বাঁশ দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাঁচা বাঁশের ব্যবহার ইদানিং বড্ড বেশিই দেখা যাচ্ছে।

bambooআবার মানুষকে কিভাবে বাঁশ দিতে হয় তা শুনেছি এবং দেখেছি ছোটবেলা থেকেই। এখন ভরা যৌবনে এসে দেখছি ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার সরকারী নির্মাণ কাজে (চুয়াডাঙ্গায়) রডের বদলে কিভাবে বাঁশের ব্যবহার করতে। আসলে আজকাল কনক্রিটের এই শহরে বিশাল বিশাল উঁচু সব অট্টালিকা তৈরীতে যে পরিমাণে (অযথা) দামি রডের ব্যবহার করে টাকা অপচয় করা হয়(?) সে হিসেব করলে রডের বদলে বাঙ্গালীর বাপ-দাদাদের সংস্কৃতি ‘ আসলে দিলে বাঁশই দেয়া উচিৎ, রড নয়। বাঙ্গালী জাতির সবকিছুতেই দুই নম্বরীর ভীড়ে শুধু বাঁশ দেয়াই বাকী ছিল, সুযোগ্য মিতব্যয়ী প্রকৌশলীর বদৌলতে সেটিরও দেয়া হয়ে গেল। আবার দেখলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও বয়স নির্ধারণের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ পুরোনো গুরত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণে পৃথক কোনো কক্ষ, আলমারি কিংবা সেলফ না থাকায় নথিপত্র সংরক্ষণ করা হচ্ছে বাঁশের তৈরি সেই মাচা দিয়েই।
অন্যদিকে, জন্মের পর স্কুলের গণ্ডিতে শিক্ষকের হাতের বাঁশের কঞ্চির (বাড়ি) আঘাত খায়নি এমন ছাত্র খব কমই আছে। আবার মৃত্যুর পর যেই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে আমাদের স্থান হবে সেখানকার মাচালও তৈরী হয়ে থাকে সেই বৈচিত্রময় ও বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী সেই বাঁশ দিয়েই। তাহলে জন্ম (শিক্ষার শুরু) থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছুতেই যদি বাঁশের ব্যবহার এতোই মূল্যবান ও জরুরী হয়েই থাকে, আমাদের জীবন, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার, নির্মাণ স্থাপত্যে, নথিপত্র সংরক্ষণে বাঁশের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়লে আসুন আমরা সবাই একযোগে আওয়াজ তুলি ‘বাঁশকে অবিলম্বে জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হোক এবং অযথা-অন্যায়ভাবে বাঁশঝাড় নির্মূল চরমভাবে নিষিদ্ধ করা হোক। এতোকিছুর পরেও যারা বাঁশ নিধন চক্রান্তে জড়িত থাকবে প্রয়োজনে তাদেরকে ‘পাকিস্তানের চর’ আখ্যা দিয়ে তাদের নির্মূলে ‘বাঁশখাদক-দালাল নিমূল কমিটি’ গঠন করে শাহবাগে প্রকাশ্যে ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই, আওয়াজ তোলা হোক।’

লেখকঃ সাংবাদিক ও সাবেক সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব।