শিরোনাম :

  • সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান ২১ নেতা-কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ শিক্ষার্থীসহ ১২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর বাইরে তদন্তে আরও ৮৯ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও সম্পূরক অভিযোগপত্র দেবে সংস্থাটি। সিআইডির তালিকা ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জড়িতদের মধ্যে অন্তত ২১ জন ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতা-কর্মী।

ছাত্রলীগের জড়িত ২১ জনের মধ্যে ১৮ জন বিভিন্ন কমিটির পদধারী নেতা ছিলেন। আর তিনজন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী।

দেড় বছরের দীর্ঘ তদন্ত শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁস মামলার এই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে সিআইডি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সংস্থার প্রধান মোহা. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চক্রের প্রধানসহ ৪৭ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। এঁদের একজন ছাড়া সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ৭৮ জন পলাতক। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ সালের ৬৩ ধারা ও পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ সালের ৪/৯(খ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ২০১১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এই চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। পরীক্ষা শুরুর আগে প্রেস থেকে ছাপা প্রশ্ন নিয়ে প্রথমে তারা মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তর পাঠাত। পরে তারা ডিজিটাল যন্ত্রাংশের ব্যবহার বাড়ায়। ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, অন্তত দুটো বিসিএস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁসেও এই চক্র সক্রিয় ছিল। চক্রের মূল নেতারা অঢেল অবৈধ অর্থসম্পদের মালিক হন। এসব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে ইতিমধ্যে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মানি লন্ডারিং মামলাও করেছে সিআইডি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১ জন ছাত্রী। গ্রেপ্তার রয়েছেন ২১ জন। বাকি ৬৬ জনের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ অভিযোগ ওঠার পর গা ঢাকা দিয়েছেন। ৮৭ জনের মধ্যে বেশ কয়েকজন চক্রের সদস্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি হওয়া এবং জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে এই ৮৭ জনের মধ্যে ১৫ জনকে বহিষ্কার করেছিল। অভিযুক্ত হিসেবে অন্য যাঁদের নাম সিআইডির তদন্তে এসেছে, তাঁদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান গতকাল প্রথম আলোকে বলেছেন, অভিযোগপত্র হাতে পেলে শৃঙ্খলা পরিষদের সুপারিশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক ২১ নেতা-কর্মীঃ অভিযুক্তদের মধ্যে ছাত্রলীগের অন্তত ২১ জন সাবেক ও বর্তমান নেতা-কর্মী আছেন। তাঁরা হলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক উপসম্পাদক মহিউদ্দিন রানা, সহসম্পাদক বেলাল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মশিউর রহমান, আপ্যায়ন সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক আবু জোনায়েদ, পাঠাগার সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক মাসুদ রানা, এফ রহমান হলের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সম্পাদক লাভলু রহমান, জহুরুল হলের উপ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক মো. বায়েজিদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক এম ফাইজার নাঈম, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের উপগণশিক্ষা সম্পাদক আফসানা নওরিন, রোকেয়া হলের বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ফাতেমা তুজ জোহরা, সূর্য সেন হলের উপপ্রচার সম্পাদক সাবিরুল ইসলাম, জগন্নাথ হলের বর্ধিত কমিটির সহসম্পাদক শাশ্বত কুমার ঘোষ, ঢাকা কলেজের সাবেক সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও সাগর সাহা, সোহরাওয়ার্দী কলেজের সাবেক সহসভাপতি প্রণয় পাণ্ডে ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সভাপতি রাজীবুল ইসলাম। হাসিবুর রহমান, খালিদ হাসান ও রবিউল ইসলাম ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া আছেন মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সভাপতি ইশরাক হোসেন।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাদকের মতো এই প্রশ্ন ফাঁসও তরুণ সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে দলমত-নির্বিশেষে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশব্যাপী আলোচিত এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার শুরু ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর মধ্যরাতে। ওই দিন গণমাধ্যমকর্মীদের দেওয়া কিছু তথ্যের সূত্র ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হল থেকে ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন রানা এবং অমর একুশে হল থেকে আবদুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন পরীক্ষার হল থেকে ইশরাক হোসেন নামের এক পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়। এ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে পরে একে একে চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের নাম বেরিয়ে আসে।

প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসঃ সিআইডির প্রধান শফিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মূলত দুই ভাবে জালিয়াতি হয়। একটি চক্র প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে; অন্যটি পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র নিয়ে দ্রুত তা সমাধান করে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করে। পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রিন্টিং প্রেস থেকে যে চক্রটি প্রশ্নপত্র ফাঁস করত, তার মূল সদস্য নাটোর জেলার ক্রীড়া কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান, প্রেস কর্মচারী খান বাহাদুর, তাঁর আত্মীয় সাইফুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বনি, মারুফসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। এই চক্র ২০১৫ ও ২০১৬ সালেও ফাঁস করা প্রশ্ন নিয়ে সাভারের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার একটি বাসায় ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছিল। এ ছাড়া ডিজিটাল ডিভাইস চক্রের অন্যতম সদস্য বিকেএসপির সহকারী পরিচালক অলিপ কুমার বিশ্বাস, ইব্রাহীম, মোস্তফা কামাল, হাফিজুর রহমান হাফিজ ও তাজুল ইসলামও গ্রেপ্তার হয়েছেন।

রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের পিপলস প্রিন্টিং প্রেস থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, জানতে চাইলে উপাচার্য আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসে ছাপা হয় না। সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিন সিদ্ধান্ত নেন কোন ছাপাখানায় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ছাপা হবে। সিআইডি তাদের তদন্তে ছাপাখানা থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা পায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলার প্রধান আসামি হাফিজুর রহমান একসময় ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেন তিনি। আরেক আসামি মো. ইব্রাহীম ২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি টাকা আয় করেন। আসামি আইয়ুব আলী ৭০ লাখ টাকা আয় করেন। সব মিলিয়ে তাৎক্ষণিক তদন্তে প্রায় ২০ কোটি টাকার অর্থ ও সম্পদের সন্ধান পেয়েছেন তাঁরা।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই চক্র শনাক্তে তদন্ত করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। এই ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, দেশের যেকোনো প্রান্তে যাঁরাই প্রশ্নপত্র ফাঁস করছিলেন, তাঁরা কোনো না কোনোভাবে এই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মানি লন্ডারিং মামলাটি এখনো তদন্তাধীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতিগত ভুলের কারণেই জালিয়াত চক্র অসদুপায়ের সুযোগ পায়। তাঁর মতে, নৈর্ব্যক্তিক পদ্ধতিতে যে পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে এমনিতেই মেধার সঠিক যাচাই সম্ভব নয়। প্রশ্নের উত্তর লিখে দেওয়ার পদ্ধতি চালু করলে জালিয়াত চক্রও কোনো সুবিধা করতে পারবে না।