কে হচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান?

নিজস্ব প্রতিবেদক : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় পার্টি সবসময়ই ভোটের রাজনীতিতে আলোচিত দলের জায়গা ধরে রেখেছে। এরশাদ বেঁচে থাকতে তিনিই দলের সব সিদ্ধান্ত নিতেন এবং বাস্তবায়ন করতেন। এরশাদের জীবনাবসানের পর এখন সামনে আসছে দলটির নেতৃত্বের প্রশ্ন। নেতাকর্মীরাই উত্তর খুঁজছেন এ প্রশ্নের- কে হচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান? 

জাপার শীর্ষ নেতৃত্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে দেখা হয় এরশাদের ভাই ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের এবং স্ত্রী ও সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে। এরশাদ বেঁচে থাকতেই এ দু’জনের বিরোধ ছিল অনেকটা প্রকাশ্য। তাদের বিরোধের প্রভাব দেখা যায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও। অর্থাৎ নেতাদের ‘জিএম কাদেরপন্থি’ অথবা ‘রওশনপন্থি’ বলে চিহ্নিত করা যেতো তখন থেকেই।

যেমন প্রেসিডিয়াম সদস্য আছেন মসিউর রহমান রাঙ্গা (মহাসচিব), ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, ফখরুল ইমাম, মুজিবুল হক চুন্নু, নুর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, সুনীল শুভরায়, এস এম ফয়সল চিশতী, মীর আব্দুস সবুর আসুদ, হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলনসহ কয়েক ডজন। 

এদের মধ্যে মসিউর রহমান রাঙ্গা, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমামসহ বেশ কয়েকজন ‘রওশনপন্থি’ হিসেবে পরিচিত। বাকিদের বেশিরভাগই জিএম কাদেরের সঙ্গে আছেন।

এরশাদের অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে প্রশ্নে নাম আসছে জিএম কাদের ও রওশনের। যদিও দলের দায়িত্বশীল নেতারা সামনের কাউন্সিলের কথাও বলছেন।

নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রশ্নে শেষবেলায় এরশাদ নিজেই নাটকীয় কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিশেষ করে এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তগুলো দেখা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে।

নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় মসিউর রহমান রাঙ্গাকে। 

নিজে চিকিৎসা নিতে বিদেশ যাওয়ার আগে ১ জানুয়ারি প্রথম জাতীয় পার্টিতে নিজের ‘উত্তরসূরী’ হিসেবে ছোট ভাই কাদেরের নাম ঘোষণা করেন এরশাদ। সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা পদেও সামনে আনা হয় তাকে। এরপর এরশাদের অনুপস্থিতিতে জিএম কাদের দল চালানোর দায়িত্বভার গ্রহণ করলে পার্টির মধ্যে তৈরি হয় অস্থিরতা। এজন্য ‘রওশনপন্থি’দের দিকে আঙুল তোলেন ‘কাদেরপন্থি’রা।

এরশাদ চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরার পর ২২ মার্চ জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেন। পরের দিন সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকেও কাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সংসদের উপনেতা করা হয় রওশনকে। তখনও খবর ছড়ায়, রওশনের চাপেই ছোট ভাই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদ দিয়েও প্রত্যাহার করা হয়েছে। 

এরপর দুই সপ্তাহ পার না হতেই গত ৪ এপ্রিল জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যানের পদ ফিরিয়ে দেন এরশাদ। দুই দিন পর এক ‘সাংগঠনিক নির্দেশে’ তাকে আবার দলের ‘ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান’ও ঘোষণা করেন।

সবশেষ এরশাদ অসুস্থতায় শয্যাশায়ী হওয়ার আগে ৪ মে রাতে বারিধারায় নিজের বাসভবনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন। 

এরশাদের অনুপস্থিতিতে গত ৩ জুলাই জাপার বনানী কার্যালয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের নিয়ে যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সভাপতিত্ব করেন জিএম কাদের। ওই সভায় উপস্থিত হননি রওশন এরশাদ। 

সাংবাদিকরা জানতে চাইলে পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা তখন বলেন, ‘উনি অসুস্থ তাই আসতে পারেননি। তাকে সভার সব খবর সঙ্গে সঙ্গে জানানো হয়েছে।’

আর এরশাদ অসুস্থ হয়ে সিএমএইচে ভর্তি হওয়ার পর যাবতীয় ব্রিফিং জিএম কাদের করলেও হাসপাতালে নিয়মিত গিয়ে খোঁজখবর রাখছিলেন রওশন।

এদিকে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর জিএম কাদেরকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদিশা লেখেন, ‘এরশাদ সাহেব যে ওনার ভাইকে তার জায়গায় বসিয়েছেন এটিকে স্বাগত জানাই। আমি আশা করবো উনিও এরশাদ সাহেবের মতো সারাদেশ ঘুরবেন, সব নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করবেন। এছাড়া যাদের জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদেরও ফিরিয়ে আনবেন।’

জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান কে হবে জানতে চাইলে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘স্যার (এরশাদ) তো জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন। আগামী কাউন্সিলে যদি একাধিক প্রার্থীর নাম প্রস্তাব আসে, তাহলে তখন পরিস্থিতিই বলে দেবে, কে হবেন পার্টির চেয়ারম্যান।’

২০১৬ সালের ১৪ মে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পার্টির (জাপা) সবশেষ কাউন্সিল। ওই সম্মেলনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। তখন মহাসচিব হয়েছিলেন রুহুল আমিন হাওলাদার।