মা গো চলে যাচ্ছি, যে টাকা দিছ একটাও খাইনি: নিখোঁজের আগে ফাহাদ

সিলেট প্রতিনিধিঃ ফাহাদের সঙ্গে তাঁর মা আয়েশা আক্তারের শেষ কথা হয় গত ৮ মে। তখন বাংলাদেশে রাত ৮টা বাজে।ফাহাদ তাঁর মাকে বলেন, ‘মা গো,আমি চলে যাচ্ছি। আমারে যে টাকা দিছ, একটাও আমি খাইনি। দোয়া করিও মা আমার জন্য।’ রাত ১টায় তাঁর মামাকে এসএমএস করেন ফাহাদ। এসএমএসে লেখা ছিল, ‘মামা আমি বোটে।’ এরপর আর ফাহাদের কোনো খোঁজ নেই।

তিউনিসিয়ার উপকূলে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন মৌলভীবাজারের ফাহাদ আহমদ (১৮)। বড়লেখা উপজেলার পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গাজিটেকা পূর্বের চক এলাকায় দুবাইপ্রবাসী আব্দুল আহাদের ছেলে তিনি।

সাগরে ছেলে নিখোঁজ, এটা শোনার পর থেকেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন আয়েশা আক্তার। ছেলের কথা বলছেন আর কান্নাকাটি করছেন। তিনি বলেন, ‘ছেলের কোনো খবর নাই। অনেকে অনেক রকম খবর এনে দিচ্ছে, আমি শান্তি পাচ্ছি না।’

তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে ফাহাদ ছিলেন সবার বড়। স্থানীয় একটি কলেজে পড়তেন অনার্স ১ম বর্ষে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের বোয়ালি এলাকার নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি ফাহাদকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

ফাহাদের পরিবার চায়নি তিনি সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাক। কিন্তু নাসির উদ্দিন ফাহাদকে পটিয়ে ফেলে। নাসির বলেছিলেন, কোনো সমস্যা হবে না। ওকে জাহাজে পাঠানো হবে। এতে ভয়ের কিছু নেই। ফাহাদ অনেকটা জোর করেই মাকে বাধ্য করেন। তখন আট লাখ টাকায় চুক্তি হয়। মায়ের কাছে নগদ দুই লাখ টাকা ছিল। বাকিটা অনেকের কাছ থেকে ধার করে জোগার করা হয়।

২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর ফাহাদ ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। দুবাই, তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। লিবিয়াতে পৌঁছানোর তিন মাস পরে একবার তাঁকে সাগরপথে ইতালির উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিল।

সেবার ধরা পড়ে যান। এরপর লিবিয়াতেই ছিলেন। ধরা পড়ার পর ফাহাদকে দেশে ফেরত আনার জন্য নাসির উদ্দিনকে চাপ দেওয়া হয়। নাসির উদ্দিন তাঁকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর কিছুদিন পর পরই ভিডিও কলে ফাহাদের দিকে বন্দুক ধরে তাঁর মায়ের কাছে টাকা চাওয়া হয়। সন্তানের মায়ায় মা আয়েশা আক্তার প্রতিবেশীর কাছে বাড়ি বন্ধক দেন। একে একে সব মিলিয়ে ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন।

ফাহাদের স্বজনরা জানান, টাকা নেওয়ার পরও এত দিন ছেলের ওপর নির্যাতন চলেছে। খাবারও ঠিক মতো দিত না।

লিবিয়া থেকে ইউরোপের উদ্দেশে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে গত ১০ মে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। ত্রিপোলিতে বাংলাদেশি দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর এ এসএম আশরাফুল ইসলাম বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে জানান, ভূমধ্যসাগর হয়ে লিবিয়া থেকে ইতালির উদ্দেশে দুটি নৌকা যায়। এর মধ্যে একটিতে ছিল ৫০ জন ও অন্যটিতে ৭০ জন। প্রথমটি ইতালি পৌঁছাতে পারলেও ডুবে যায় দ্বিতীয়টি।