ফ্যাসিস্টবিরোধী জাতীয় ঐক্যকে শক্তিতে পরিণত করতে হবে – সালাহউদ্দিন
নির্বাচন কমিশনের ২০১৯
স্বেচ্ছাচারিতা অনিয়ম কর্তৃত্বের লড়াই ভাতা ও কেনাকাটায় কেলেঙ্কারি
এ বি এন হুদা |♦|
ঢাকার দুই সিটি ও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে বিতর্কের মুখে ছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর বছরের শেষার্ধে বেশিরভাগ সময় আলোচনায় ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের কর্তৃত্বের লড়াই। এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটিতে ভোটের তফসিল ঘোষণা করেছে কমিশন। এছাড়া বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা অন্তর্ভুক্তি, নির্বাচনী প্রশিক্ষণে বক্তৃতা ভাতার নামে কমিশনার ও কয়েক কর্মকর্তার কোটি কোটি টাকা নেয়া, কমিশন সচিবালয়ের ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ক্রয় নিয়ে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ।
বছরের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্য বছরগুলোর মতোই এ বছর পার করেছে কমিশন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কমিশন সংবিধান, আইন ও বিধি অনুযায়ী চলে। এ বছরও তাই করেছে। ইসি সচিবালয়ের কার্যক্রম নিয়ে কমিশনারদের বিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের (সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার) মধ্যে মনোমালিন্য বা অন্য কিছু নেই। আমাদের একজন বলছেন কার্যক্রম এ রকম হবে, আরেকজন বলছেন ওরকম হবে। এটাই পার্থক্য।
ইসির পুরো বছরের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই ইসি নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ভেঙে ফেলেছে। কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। মানুষ ভোটের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। তিনি বলেন, কমিশন সচিবালয়ে স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্বয়ং নির্বাচন কমিশনাররা। তারা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন, যা আইনের লংঘন। এসব ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অপসারণ করতে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ জানাই।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা নির্বাচন : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ না কাটতেই বছরের শুরুতে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের আয়োজন করে কমিশন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন ও সম্প্রসারিত ওয়ার্ডগুলোতে সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোট হয়। একইদিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সম্প্রসারিত ওয়ার্ডগুলোতেও সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোট হয়। বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এতে অংশ নেয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ও ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে প্রচারসহ কমিশনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে নির্বাচন ছিল অনেকটা ভোটারবিহীন। ওই নির্বাচনে তিন, সাত, নয় ভোট পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার দায় সিইসি রাজনৈতিক দলগুলোকে দেন।
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও বিপত্তি হয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত পাঁচ ধাপে প্রায় ৫শ’ উপজেলায় ভোট হয়। এ নির্বাচনেও কমিশনের ওপর অনাস্থা জানিয়ে অংশ নেয়নি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের দলগুলো। এতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। অন্তত ৩৪টি উপজেলায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পান। এছাড়া ৬৩টি উপজেলায় চেয়ারম্যান বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পাঁচ ধাপে গড়ে ৪০ শতাংশের মতো ভোট পড়ে। এ নির্বাচনে বাঘাইছড়িতে ভোটের সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার সময় ব্রাশফায়ারে একইসঙ্গে ৭ জনের মৃত্যু হয়।
ওই নির্বাচনের আগের রাতে ভোট কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারা ও সহিংসতা বন্ধে ইসি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় ‘সুজন’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কয়েকজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ কমিশনের তুমুল সমালোচনা করেন। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে মন্তব্য করে কমিশনারদের পদত্যাগও দাবি করেন। এমনকি কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনেরও দাবি ওঠে। বছরের শেষপ্রান্তে এসে ২২ ডিসেম্বর ঘোষণা করে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের তারিখ। এ নির্বাচনের পরিবেশ কেমন হয় তা পর্যবেক্ষণ করছেন পর্যবেক্ষক মহল।
কমিশনার ও ইসি সচিবালয়ের মধ্যে দূরত্ব : ২০১৮ সালে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সঙ্গে অন্য কমিশনারদের দূরত্বের বিষয়টি ফুটে ওঠে। ওই সময়ে কয়েকবার কমিশন সভা বয়কট করেন এ কমিশনার। তবে চলতি বছর কমিশনারদের মধ্যকার সম্পর্কে নতুন মোড় নেয়। এবার ইসি সচিবালয়ে ৩৩৯ জন কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে সিইসি ও ইসি সচিবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন চার কমিশনার। তারা ইসি সচিবালয়ের কার্যক্রমের ওপর তাদের কর্তৃত্বের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২৪ নভেম্বর চার কমিশনার এ বিষয়ে সিইসিকে একটি ‘ইউও নোট’ দেন। পরে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। ৯ ডিসেম্বর সিইসি চার কমিশনারকে ওই ‘ইউও নোট’র জবাব দেন। কিন্তু ইসির কর্মকর্তাদের অনুস্বাক্ষরে দেয়া ওই জবাবে আরও ক্ষুব্ধ হন চার কমিশনার। ১১ ডিসেম্বর কমিশন সভায় এ বিষয়ে চার কমিশনার ক্ষুব্ধ বক্তব্য দেন। তাদের কেউ কেউ কমিশন সচিবালয়ের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও মিথ্যাচারের অভিযোগও আনেন। এর আগে ৪ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভা নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কমিশনার মাহবুব তালুকদার অধিকার খর্বের অভিযোগ এনে ‘ইউও নোট’ দিয়েছিলেন। জানা গেছে, এখনও কমিশনারদের দ্বন্দ্বের সুরাহা হয়নি। তবে ২২ ডিসেম্বর ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় সিইসির পাশে বসেন চার কমিশনার।
ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা : ভোটার তালিকায় কয়েকজন রোহিঙ্গা থাকার বিষয়টি ছিল আলোচনায়। বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে জানা গেছে, ইসির নিজস্ব ও প্রকল্পের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে দিয়েছেন। এ পর্যন্ত নির্বাচন অফিসের চারজন স্থায়ী ও প্রকল্পের অধীনে কর্মরত সাতজনসহ মোট ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে নির্বাচন কর্মকর্তাদের অর্থিক দুর্নীতির তদন্তে নেমেছে দুদক। চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন নির্বাচনী কর্মকর্তার সম্পদের তথ্য চেয়ে চিঠিও দিয়েছে। দুদকের একটি সূত্র জানায়, এনআইডি জালিয়াতির মাধ্যমে ইসির কর্মকর্তারা বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় করেছেন। এসব ঘটনায় কমিশন তিনটি কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে।
বক্তৃতা ভাতা কেলেঙ্কারি : একাদশ জাতীয় সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনের প্রশিক্ষণে বক্তৃতা ভাতার নামে সিইসি ও চার কমিশনার এবং ইসির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার কোটি কোটি টাকা নেয়ার ঘটনা ছিল বছরের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ‘বিশেষ বক্তা’, ‘কোর্স উপদেষ্টা’ ও ‘কোর্স পরিচালক’ হিসেবে তারা এসব টাকা নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত তা অনুসন্ধানে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করেনি কমিশন। নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক মোস্তফা ফারুককে ওই পদ থেকে সরিয়ে ফরিদপুরের আঞ্চলিক কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করে দায়িত্ব সেরেছে ইসি।
কেনাকাটা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ : নির্বাচন কমিশনের ল্যাপটপ, ট্যাবসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও জিনিসপত্র কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ ছিল চলতি বছরের অন্যতম আলোচনার বিষয়। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠ পর্যায়ের ১৫শ’ ল্যাপটপ ও প্রিন্টার কেনা নিয়ে অনিয়মের ঘটনায় রিপোর্ট প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তর। সাজানো টেন্ডারের মাধ্যমে ওই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করছিল ইসি সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। তবে ওই সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে কমিশন সচিবালয়। ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনকে শোকজ করা হয়। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে কমিশন। এছাড়া নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ও ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে ব্যবহারের নামে ৪২ হাজার ট্যাব কিনেছে ইসি সচিবালয়। এসব ট্যাব কেনা ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি : দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছর প্রথমবার প্রবাসীদের ভোটার করার কার্যক্রম শুরু হল। প্রথম পর্যায়ে মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে আরও কয়েকটি দেশের প্রবাসীদের ভোটার করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। ইসির এ উদ্যোগের ফলে প্রবাসীরা দেশে না এসেই ভোটার হওয়া ও জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ইসির এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রবাসীরা। এছাড়া যেসব প্রবাসী দেশে আসছেন তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভোটার করার বিষয়ে ইসির কার্যক্রম চলমান। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলে একদিনেই ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে পারছেন প্রবাসীরা।

