ফ্যাসিস্টবিরোধী জাতীয় ঐক্যকে শক্তিতে পরিণত করতে হবে – সালাহউদ্দিন
রাজনীতিতে ত্যাগী কর্মীদের ন্যায্য মূল্যায়ন: একটি বাস্তব ও দার্শনিক পর্যালোচনা
সানী নাসিরুদ্দীন:
রাজনীতি শব্দটি উচ্চারিত হলেই এর সঙ্গে ক্ষমতা, নেতৃত্ব, আদর্শ, সংগ্রাম এবং জনমানুষের ভবিষ্যতের প্রশ্ন জড়িয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি কি সেই আদর্শকে ধারণ করতে পারছে, নাকি ধীরে ধীরে এটি এক ধরনের ক্ষমতার কাঠামোগত খেলায় পরিণত হয়েছে—যেখানে ত্যাগ নয়, বরং লবিং, প্রভাব এবং অর্থনৈতিক শক্তিই অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারণ করছে নেতৃত্বের অবস্থান?
এই প্রশ্ন আজ কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং সমগ্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানো একটি সামাজিক প্রশ্ন।
রাজনীতির মৌলিক সংজ্ঞা হলো—এটি জনগণের কল্যাণে পরিচালিত একটি সংগঠিত ব্যবস্থা, যেখানে নেতৃত্ব গড়ে ওঠে যোগ্যতা, ত্যাগ এবং জনসমর্থনের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময় এই সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না। মাঠপর্যায়ের ত্যাগী কর্মীরা বছরের পর বছর আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকলেও নেতৃত্ব নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপে তাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক সময় কেন্দ্রীভূত থেকে যায় কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—রাজনীতি কি সত্যিই গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা-নির্ভর ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে?
রাজনৈতিক সংগঠনের প্রাণ হলো তৃণমূল কর্মী। তারাই রাজপথে থাকে, ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মিছিল করে, মামলা-হামলার শিকার হয় এবং সংগঠনের ভিত্তি শক্ত করে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই ত্যাগ কি যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়?
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মিছিলের সামনের সারিতে থাকা কর্মীরা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় নেই, দীর্ঘদিনের সংগঠকরা মনোনয়নের ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হন, আর নতুন বা প্রভাবশালী বলয়ের ঘনিষ্ঠরা দ্রুত নেতৃত্বে উঠে আসেন। এটি শুধু ব্যক্তি অবমূল্যায়নের বিষয় নয়, বরং একটি কাঠামোগত সংকট।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে কর্মীদের অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক দেশে অভ্যন্তরীণ ভোট, প্রাইমারি নির্বাচন বা সদস্যভিত্তিক মনোনয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে নেতৃত্ব উঠে আসে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় এই প্রক্রিয়া অনেক সময় সীমিত থাকে বা বিভিন্ন অদৃশ্য প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—একটি দল যদি নিজের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেই পূর্ণ গণতন্ত্র চর্চা না করে, তবে সে কীভাবে রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে?
লবিং ও অর্থনৈতিক প্রভাব রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি কঠিন দিক। এটি নতুন কোনো বিষয় নয়, কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এটি যোগ্যতা ও ত্যাগের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। যখন নেতৃত্ব নির্বাচনে অর্থনৈতিক শক্তি, প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক বা ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ত্যাগী কর্মীরা প্রান্তে চলে যান।
এই পরিস্থিতি শুধু নৈতিক সংকট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক দুর্বলতারও উৎস।
বাংলাদেশের প্রবাসী সমাজও এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় এক কোটি বা তারও বেশি প্রবাসী নাগরিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। তারা দেশের অর্থনীতি, পরিবার এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকলেও অনেক সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে। তাদের মতামত, নেতৃত্ব বা ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই কাঠামোগতভাবে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
এই প্রবাসী শক্তি, তৃণমূল কর্মীদের ত্যাগ এবং মেধাবী নেতৃত্ব—এই তিনটি স্তম্ভ যদি একত্রিত করা যায়, তবে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন ত্যাগের মূল্যায়ন হয় না, তখন ধীরে ধীরে হতাশা জন্ম নেয়। আর সেই হতাশা রূপ নেয় আস্থাহীনতায়। মানুষ তখন রাজনীতিকে ক্ষমতার খেলা হিসেবে দেখতে শুরু করে, আদর্শিক সংগ্রাম হিসেবে নয়। এই মানসিক পরিবর্তন একটি জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব হলো যোগ্যতা বনাম আনুগত্য। একটি সুস্থ রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হওয়া উচিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং নৈতিকতার ওপর। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় আনুগত্যই হয়ে ওঠে প্রধান মানদণ্ড। এই প্রবণতা নেতৃত্বের মানকে দুর্বল করে এবং তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে।
একটি রাজনৈতিক দল তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে নিজের ভেতরের মেধা, ত্যাগ এবং সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। অন্যথায় সংগঠন ধীরে ধীরে তার ভিত্তি হারাতে শুরু করে।
রাজনীতি যদি সত্যিই জনগণের জন্য হয়, তবে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ত্যাগের স্বীকৃতি, স্বচ্ছ মনোনয়ন ব্যবস্থা, প্রবাসীদের অন্তর্ভুক্তি এবং নৈতিক রাজনীতির চর্চা অপরিহার্য। এগুলো ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।
সমালোচনা সবসময় কঠিন, কিন্তু প্রয়োজনীয়। কারণ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো বাস্তবতাকে স্বীকার করা। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—ত্যাগ কখনো হারায় না, কেবল স্বীকৃতি পেতে সময় নেয়।
আজ যাদের অবহেলা করা হচ্ছে, কাল তারাই হতে পারে পরিবর্তনের মূল শক্তি। রাজনৈতিক ইতিহাসের এই চক্র একদিন আবার নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
লেখক: প্রবাসী সংগঠক

