কেকহীন জন্মদিন কি সুদিন আনবে বিএনপির?

khaleda-tareq_34232মোস্তফা কামাল : এবার কেক কেটে ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করেননি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তা করা হয়েছে ঘোষণা দিয়েই। একদিন আগে ১৪ আগস্ট গণমাধ্যমকে আগামভাবে দলের পক্ষ থেকে ঘোষণাটি জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি জানান, দেশে জঙ্গি হামলার আতঙ্ক, নেতাকর্মীরা মামলায় জর্জরিত, বিভিন্ন স্থানে বন্যা ছাড়াও নানা সংকটসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে বিবেচনায় এ বছর জন্মদিনের কেক কাটার আনুষ্ঠানিকতা করছেন না বিএনপি চেয়ারপারসন। তবে, দিনটি উদযাপন করা হবে না, স্পষ্ট এমন কথা বলেননি তিনি। তার এ অস্পষ্টতার রহস্য ভেদ হয় পরে মিলাদ আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহতের দিনটিতে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালনের ঘোরতোর বিরোধী আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন মহল। এটি তার প্রকৃত জন্মতারিখ নয় এমন তথ্য-সাবুদও তারা উপস্থাপন ও প্রচার করেছেন বিভিন্ন সময়। এ নিয়ে রাজনীতি চলেছে বিরতিহীনভাবে। কথা, পাল্টা কথা হয়েছে কখনো কখনো নোংরা- অশালীন মাত্রায়। এমন একটি বেদনাবিধূর দিনে বেগম জিয়া জন্মদিন উদযাপন না করলে দুই নেত্রী ও দুই দলের দূরত্ব কমতে পারে এই থিওরিও দিয়েছেন কেউ কেউ। এতে কাজ হয়নি। যার যা করার করে গেছেন। তারপরও এই আনুষ্ঠানিকতা ও বাতচিতে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে গত বছর। বেগম খালেদা জিয়া গত বছরের এ সময়টায় দেশে ছিলেন না। চিকিৎসা ও তারেক রহমানের সাথে দেখার উদ্দেশ্যে ছিলেন লন্ডনে । তাই দেশে এদিন কোনো আয়োজন ছিল না। ছাত্রদল ছোট আয়োজনে বেগম জিয়ার জন্মদিন পালন করেছে ১৫ আগস্ট দিনগত রাত বারোটা এক মিনিটে। অর্থাৎ ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসাবে তা ১৬ আগস্ট। এবার চিত্র আরেকটু পাল্টালো। বলা হচ্ছে, জঙ্গি হামলার আতঙ্ক, নেতাকর্মীদের মামলাসহ চলমান সংকটময় পরিস্থিতির কথা। মোটেই ১৫ আগস্ট শোক দিবসের কারণে নয়। আগামীতে বা ভবিষ্যতে এ দিনে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মোৎসব করা হবে না- এমন কোনো কথা বলা হয়নি। তবে, এবার জন্মদিন পালন না করার তথ্য দেয়ার সময় গয়েশ্বর রায় কিছু কথা বলেছেন এ নিয়ে। তিনি জানান, বেগম জিয়া কখনোই নিজের ইচ্ছায় আনুষ্ঠানিকভাবে জন্মদিন পালন করেন না। নেতাকর্মীরা কেক নিয়ে গিয়ে তাকে অনুরোধ করেন তা কাটার জন্য। তখন তিনি কাটেন।
সবমিলিয়ে ১৫ আগস্টে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন প্রশ্নে বিএনপির পিছুটান স্পষ্ট। তা কতোটা রাজনীতি, কতোটা কৌশল আর কতোটা চলমান দুর্দিন সামলানোর পন্থা এ নিয়ে আলোচনা বিস্তর। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে দু’ধরনের প্রতিক্রিয়াই এসেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন এটি ভালো লক্ষণ। প্রেসিডিয়াম সদস্য, ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম এ সিদ্ধান্তকে বলেছেন বেগম খালেদা জিয়ার শুভবুদ্ধির উদয়। আগামীতেও তা অব্যাহত রাখার আহবান জানিয়েছেন তিনি। আর দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার বদলে ভিন্ন কারণ দেখিয়ে জন্মদিন উদযাপন না করায় প্রমান হয় খালেদা জিয়ার মানসিকতা বদলায়নি। দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেই এ ধরনের বক্তব্য আসছে। তা হয়তো আরো চলবে। ডালপালাও ছড়াবে। এরপরও খালেদা জিয়ার জন্মদিন রাজনীতিতে নতুন উপসর্গই জোগ করলো। অন্যসব উপাদান ও উপসর্গে গানিতিক- জ্যামিতিক দুই হারেই পিছিয়ে থাকা দলটিকে নানা ইস্যুতে দুমড়িয়ে-মুচড়িয়ে হলেও টিকে থাকতে হচ্ছে। সামনে এগুবার পথও খুঁজতে হচ্ছে।
বিপর্যস্থ কোনো দলের জন্য এটাই স্বাভাবিক। সংকট দলটিকে পিছু ছাড়ছে না। একের পর এক তা বাড়ছেই। শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও একটা দুর্যোগকাল চলছে দলটির। জাতীয় কাউন্সিল এবং নতুন কমিটি ঘোষণার পরও তা না কেটে আরো বেড়েছে। ৩৮ বছর বয়সী দলটির ১৯তম দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল হওয়ার কথা ২০১৬ সালে। কিন্তু এবার হলো তাদের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল। নানা কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল পিছিয়ে যেতে পারে। দেশের প্রধান দুই দলের অপরটি আওয়ামী লীগ। তাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব-ইয়াহিয়ার সামরিক স্বৈরাচারী শাসন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড, এরশাদের নয় বছরের স্বৈরশাসন, বিএনপি শাসনামলে বৈরী পরিস্থিতি ইত্যাদি কারণে আওয়ামী লীগ তাদের নিয়মিত কাউন্সিল করতে পারেনি। ১৯৭৮ সালে ক্ষমতাসীনদের উদ্যোগে জন্ম নেওয়া দল বিএনপিও কম বিপদের সম্মুখীন হয়নি। তাদের দলের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। জিয়াউর রহমানের হত্যাজনিত পরিস্থিতি, পরে এরশাদের নয় বছর, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার আমল এবং পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শাসনামল কোনোটাই বিএনপির জন্য স্বস্তিদায়ক হয়নি। এর জের টানতেই হচ্ছে। সহসা বা শিগগির নিস্তারের লক্ষণও নেই।

মন্তব্য প্রতিবেদনের লেখক মোস্তফা কামাল বাংলাভিশনের বার্তা সম্পাদক।