দুর্নীতির লাগাম টানতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার ভাবনা

এ আর মারুফঃ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সম্পদের হিসাব দিতে হবে আমলাদেরও। দুর্নীতির লাগাম টানতে নির্ধারিত ছকে সম্পদ বিবরণী নেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।

১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী সরকারের কাছে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদ বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক। তবে এতদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি।

জানা গেছে, সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্যোগের শুরুতেই প্রশাসনে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও এ বিধান মানতে চাচ্ছে না শীর্ষ আমলাদের একাংশ। তারা বলছেন, কর্মচারীদের এই বিধিমালা সেকেলে এবং বর্তমানে তা প্রতিপালনযোগ্য নয়। কারণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন আয়কর রিটার্ন জমা দেন এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত টিন নাম্বার রয়েছে। আবার কেউ বলছেন, এটা প্রতিপালনযোগ্য। কারণ, বিধানটি রাষ্ট্রপতির আদেশে জারি হয়েছে। এটা বাতিল করার আগ পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া আয়কর রিটার্নে কর্মকর্তাদের পুরো সম্পত্তির হিসাব পাওয়া যায় না।

অবশ্য এই বিতর্কের মধ্যেই ভূমি মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে সম্পদের হিসাব দেন, আবার অনেকে দেন না। এবার প্রত্যেকের সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন সচিব এ নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেন। এজন্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের (সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের) সচিবের কাছে তাদের সম্পদের বিবরণী জমা দিচ্ছেন না। তবে আয়কর রিটার্নে কর্মকর্তাদের পুরো সম্পদের হিসাব পাওয়া যায় না। আবার কোনো কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় পুরো সম্পদের হিসাব জমা না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। সব দিক বিবেচনা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব শিগগির নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় দুর্নীতি বন্ধে সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধেও অভিযান অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।

ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী গত ৮ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার দিনেই ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জনস্বার্থে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন। তবে কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিতে গিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। কারণ ভূমি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ক্যাডারভুক্ত সব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সহকারী সচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত সবাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাদের সম্পদের হিসাব নেওয়া-না নেওয়ার বিষয়টি ওই মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। তাই ভূমি মন্ত্রণালয় তাদের সম্পদের হিসাব নিতে পারছে না।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ মার্চ জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে কাজ করার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুল কাইউম সরকার সমকালকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও কাজ চলছে। তবে সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিধান বিধিমালাতেই আছে। এটি নতুন কিছু নয়। এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দেওয়ায় মন্ত্রণালয়ে সম্পদের হিসাব কেউ কেউ জমা দেন না। মন্ত্রণালয় থেকে হিসাব চাওয়া হলে সরকারি কর্মচারীরা এটা দেবেন। যে বিধান রয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে আমাদের কাজ। সেই বিধান বাস্তবায়ন করার জন্যই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, জনপ্রশাসন থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে যেসব কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের সম্পদের হিসাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নেবে। ফলে সেই কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। জনপ্রশাসন এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তাদের কাজ শেষ হলে কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী ভূমি মন্ত্রণালয়ে আনা হবে। এরপর প্রত্যেক কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে একাধিক সচিব বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন প্রতি বছর সম্পদের আয়কর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন। ফলে মন্ত্রণালয়ে সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যেসব দপ্তরে বেশি অর্থের লেনদেন হয় সেগুলো নজরদারিতে রাখলেই যথেষ্ট। এ ছাড়া বড় বড় দুর্নীতি ওপরের দিকেই হয়ে থাকে। নিচের দিকে দুর্নীতি হলেও তা উচ্চ পর্যায়ের তুলনায় বেশ নগণ্য। ফলে শীর্ষ পর্যায়ের আমলাদের নজরে রাখলেই দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই ভালো হবে। জনপ্রশাসন থেকে এটি বাস্তবায়ন করা হলে আরও ভালো হবে। তিনি বলেন, এটি সরকারের জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের একটি অঙ্গীকার। ফলে এই ঘোষিত নীতিমালা অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। এটি অনেক আগেই বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। কারণ, কর্মকর্তারা জনগণের টাকায় বেতন পাচ্ছেন, জনগণের জন্যই কাজ করছেন। ফলে সম্পদের হিসাব দেওয়ার অনীহা কোনো ভালো দৃষ্টান্ত নয়। জনস্বার্থে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়া প্রয়োজন।

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় তার ও তার পরিবারের সদস্যদের দখলে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা দিতে হয়। এরপর প্রতি পাঁচ বছরে একবার সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি উল্লেখ করে সরকারের কাছে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। সব গণকর্মচারীর জন্য একই বিধান প্রযোজ্য। তবে ক্যাডার বা প্রথম শ্রেণি ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা তাদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে, দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড বা নন-গেজেটেড কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিজ নিজ নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদের হিসাব বিবরণী নির্ধারিত সময়ে দাখিল করতে হবে।

‘দরকার সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা’ :সর্বশেষ ২০০৮ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়। ওই হিসাব বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। সেগুলো পর্যালোচনা করে বলা হয়নি কার সম্পদ বেড়েছে বা কমেছে।

এরপর ২০১৫ সালে শুধু ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হলেও তা পর্যালোচনা করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এবার নির্ধারিত ছকে সব সরকারি কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সম্পদ বিবরণীর ওই ছকে কী আছে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, স্থাবর ও অস্থাবর দুই ধরনের সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। স্থাবর সম্পদের মধ্যে কৃষি ও অকৃষি জমি, ইমারত, বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাখা হয়েছে। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে অলঙ্কার, স্টকস, শেয়ার, বীমা, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, মোটর গাড়ি, কম্পিউটার, টেলিভিশন, এয়ারকুলার, রেফ্রিজারেটর, ওভেনসহ ব্যবহার্য সম্পদের বিবরণ থাকবে।

এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালায় সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিধান রয়েছে। পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব দিতে তারা বাধ্য। এ ধরনের বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। বিধানটি বাস্তবায়ন করা উচিত। শুধু সম্পদের হিসাব নিলেই চলবে না, হিসাব বিবরণী পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।