ফারাক্কা নিয়ে নীতিশের প্রস্তাব বুঝতে চাইছে বাংলাদেশ

image_199434.7বিশেষ প্রতিবেদন:  বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত বিতর্কিত ফারাক্কা বাঁধ পুরোপুরি সরিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা বোঝার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব, গঙ্গার পানিপ্রবাহের উপাত্ত নিয়ে যৌথ নদী কমিশনকে একটি মূল্যায়নপত্র তৈরির নির্দেশ দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম গতকাল বুধবার তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান। নীতিশ কুমারের বক্তব্যের বিষয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞেরা উদ্ধৃত হয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে তাঁদের মতে, যেকোনো অভিন্ন নদীর প্রবাহ অবাধ হলে দুই দেশের জন্যই মঙ্গল।

গত মঙ্গলবার দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফারাক্কা নিয়ে নীতিশ কুমার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটিকে আপাতত গণমাধ্যমের প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নেতিবাচক উত্তর দেন।

জানতে চাইলে মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টিকে (ফারাক্কা নিয়ে নীতিশ কুমারের প্রস্তাব) সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে। আমরা আজকে যৌথ নদী কমিশনকে (জেআরসি) এটার ওপর একটা অবস্থানপত্র তৈরির জন্য বলেছি। সেটি পাওয়ার পর আমরা আমাদের অবস্থান ঠিক করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
তবে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমবারের মতো নীতিশ কুমারের মতো ভারতের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেওয়ার দাবি অনেককে অবাক করেছে। তিনি এ বিষয়টি সামনে নিয়ে আসায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ফারাক্কার প্রভাব নিয়ে যা বলছে, সেটি আবার সামনে চলে এল। এখন বিষয়টি ভালোভাবে জেনে-বুঝে একটা অবস্থান ঠিক করে ভারতের সঙ্গে কথা বলার কথা বিবেচনায় নেওয়া যায়।

বিবিসি বাংলা, এনডিটিভিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেন। বৈঠকের আগে সংবাদমাধ্যমকে নীতিশ কুমার বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গায় বিপুল পরিমাণ পলি জমছে। আর এ কারণে প্রতিবছর বিহারে বন্যা হচ্ছে। এর একটা স্থায়ী সমাধান হলো ফারাক্কা বাঁধটাই তুলে দেওয়া। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তি দীর্ঘদিনের।

এদিকে নীতিশ কুমার এ কথা বললেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা মানছে না। পশ্চিমবঙ্গের সেচ দপ্তর এ বিষয় নিয়ে শ্বেতপত্র ধাঁচের একটি ‘ডসিয়ের’ তৈরির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। ফারাক্কা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বক্তব্য সেখানেই তুলে ধরা হবে। নীতিশের দাবি প্রসঙ্গে নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি একসময় ফারাক্কা বাঁধের সমালোচনা করেছি। কিন্তু ১৯৭৫ সাল থেকে বাঁধটি রয়েছে। এর ফলে ফারাক্কা থেকে মোহনা পর্যন্ত পরিবেশ বদলে গেছে। একধরনের ইকোলজি তৈরি হয়েছে। কোনোভাবে বাঁধ ভেঙে দেওয়া হলে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে পরিবেশের ওপর।’
ভারতের নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্যের বাংলা দেশের নদ-নদী ও পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞ বি এম আব্বাসের লেখা ফারাক্কা ব্যারাজ ও বাংলাদেশ-এর তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা বন্দরকে পলির বিপদ থেকে রক্ষা করে নাব্যতা বজায় রাখার কথা বলে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মিত হয়। বাংলাদেশ থেকে ১৮ মাইল উজানে গঙ্গা নদীতে ১৯৭০ সালে বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পরীক্ষামূলকভাবে ভারত সরকার এটি চালু করে। এর পর তা আর বন্ধ হয়নি। এটি চালু হওয়ার পর ভাটির দিকে থাকা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়া শুরু হয়।

ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কা থেকে ৩১০-৪৫০ কিউবিক মিটার/সেকেন্ড গঙ্গার প্রবাহ প্রত্যাহার করে, যা ১৯৭৬ সালের পুরো শুষ্ক মৌসুম অব্যাহত থাকে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বলা হয়, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা উন্নয়নে পলি ধুয়ে নিতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা নদী থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ১১৩০ কিউবিক মিটারের বেশি পানি পৌঁছে দেওয়া।

ভারত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গা থেকে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখায় ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে তা উত্থাপন করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি গৃহীত হয়। যাতে ভারতকে সমস্যার একটি ন্যায্য ও দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর দুই দেশ শুষ্ক মৌসুমে পানিবণ্টনের ওপর পাঁচ বছর মেয়াদি (১৯৭৮-৮২) একটি চুক্তি সই করে। ১৯৮২ সালের অক্টোবর মাসে দুই দেশের মধ্যে ১৯৮৩ ও ৮৪ সালের জন্য গঙ্গার পানিবণ্টন-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাসে ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮—এই তিন বছরের জন্য পানিবণ্টনের ওপর আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সই করে।

ফারাক্কা-উত্তর আমলে গঙ্গার প্রবাহ-সংকট নৌপরিবহন খাতকেও আঘাত হেনেছে। এখন শুষ্ক মৌসুমে ৩২০ কিলোমিটারের বেশি প্রধান ও মধ্যম নৌপথ বন্ধ রাখতে হয়। ফারাক্কা বাঁধের ফলে গঙ্গানির্ভর এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি অধিকাংশ স্থানে ৩ মিটারের বেশি নেমে গেছে।