শিরোনাম :

  • সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

এক মাসে নিপীড়নের শিকার ১৮ সাংবাদিক, এক জনের রহস্যজনক মৃত্যু


এম আবদুল্লাহ ঃ এক মাসে ১৮ জন সাংবাদিক হামলা, মামলা, অপহরন, গ্রেফতার, নির্যাতন ও জীবন নাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এক সাংবাদিকের। আগস্ট মাসের চিত্র এটি। এছাড়া মন্ত্রীর ধমক, হুঁশিয়ারি, আদালতের সতর্কবাণীর মুখোমুখি হতে হয়েছে সাংবাদিকদের। আগস্ট মাস জুড়ে প্রধান প্রধান সংবাদপত্রে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিষয়ক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য মিলেছে।
মধ্য আগস্টে সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক মাতৃজগত এর স্টাফ রিপোর্টার রুহেল আহমেদ তালুকদারের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর আসে সংবাদপত্রে। ১৭ আগস্ট শহরের মজুমদারি তরঙ্গ আবাসিক এলাকার বাসা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ রহস্যজনক মৃত্যু হিসেবে নথিভ’ক্ত করে কোন তদন্ত ও মামলা ছাড়া পারিবারিকভাবে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে।
এ মাসের চাঞ্চল্যকর বেশ কয়েকটি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ৩ আগস্ট ফেনীর পরশুরাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক যায় যায় দিনের স্থানীয় প্রতিনিধি আবু ইউছুফ মিন্টুকে সরকার দলীয় কর্মীরা পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। তাকে প্রথমে পরশুরাম হাসপাতালে পরে ফেনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়েছে। সরকারি দলের ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচীর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন।
৭ আগস্ট সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন দৈনিক যুগান্তরের সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও স্থানীয় আজকের সিরাজগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জেহাদুল ইসলাম। পেশাগত কাজে বাসা থেকে বের হওয়ার পরই তিনি সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে এক কিশোরীকে গণধর্ষণের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশের জেরে প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ কাইসার হামিদকে হত্যার চেষ্টা করেছে গণধর্ষণ মামলার প্রধান অভিযুক্ত মেরাজ মিয়া ও তার সহযোগিরা। ৭ আগস্ট কুলিয়ারচর থানার ভিতর এ হামলার ঘটনাটি ঘটে। তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল থেকে মেরাজ মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ।
১৮ আগস্ট সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হন ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও এনটিভির জেলা প্রতিনিধি লুৎফর রহমান মিঠু। শহরের বাজারপাড়া এলাকায় চিহ্নিত মাদকসেবী বাপ্পীর ধারালো অস্ত্রের কোপে তিনি জখম হন বলে খবরে জানানো হয়।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান নাজমুস হাসিবের উপর হামলা হয়েছে ২৪ আগস্ট। কুমারখালী থানা পুলিশ প্রধান আসামি শাহিন গ্রেফতার করেছে। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১১টায় হাসিব উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রাম বাজার সংলগ্ন কালি নদীর পাড়ে সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গেলে শাহিন অতর্কিতে চড়াও হয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে পাশে থাকা কাঠের বাটাম দিয়ে হাসিবকে পেটাতে থাকে। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসিবকে কুমারখালী হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে বলে প্রকাশিত খবরে জানা যায়।
২৮ আগস্ট নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার মোহাম্মদপুর এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন দৈনিক আলোকিত সকাল ও স্থানীয় দৈনিক আলোকিত নোয়াখালী পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার মোঃ সাকিব। ঘটনার দিন পত্রিকার অফিস থেকে ফেরার পথে সাকিবের উপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মারাত্মক ভাবে জখম করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
মোহনা টিভির সিনিয়র সাংবাদিক এফ এম মুশফিকুর রহমানের নিখোঁজ নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মাসের শুরুতে। ৩ আগস্ট রাতে গুলশান থেকে তিনি নিখোঁজ হন। এনিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে উদ্ধারের জন্য নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর বিটে কর্মরত মুশফিককে তিন দিনের মাথায় সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কের গোবিন্দপুর এলাকায় ভোরে একটি গাড়ি থেকে ফেলে যাওয়ার পর এলাকাবাসী পুলিশে খবর দেয়। দুর্বৃত্তরা গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর তাকে পেছন তাকাতে নিষেধ করে। তাকালে গুলির হুমকি দেয়। গুলশানে চোখে কিছু একটা ছিটিয়ে গাড়িতে তুলে পরে চোখ বেঁধে ফেলা হয় বলে জানান মুশফিক। তাকে মারধোরও করা হয় বলে অভিযোগ করেন। উদ্ধারে সাংবাদিক সমাজে স্বস্তি ফিরলেও কারা তাকে অপহরণ করেছে তা অজানাই রয়ে গেছে।
এদিকে সাংবাদিকের দায়ের করা ডিজিটাল আইনের মামলায় সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে এ মাসে। ২৩ আগস্ট খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতির মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রথম সময়ের সম্পাদক শাহীন রহমান। ফেসবুক ও একটি অনলাইনে খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এস এম হাবিবের বিরুদ্ধে মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশ ও স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগে ডিজিটাল আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় খুলনা পুলিশ ঢাকার নাখালপাড়া থেকে শাহীন রহমানকে ধরে নিয়ে যায়। গ্রেফতারের আগে পরে তাঁর বিরুদেদ্ধ আরও তিনটি মামলা হয়েছে। এখনও তিনি জেলে রয়েছেন।
ফেনীর ৬ সাংবাদিককে মামলায় ফাঁসানোর খবর আগস্টে বেশ আলোচিত ছিল। জেলার সোনাগাজীতে চাঞ্চল্যকর নুসরাত রাফি হত্যা মামলাকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল ফেনীর তৎকালীন এসপি জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও সোনাগাজীর ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের। সাংবাদিকদের অনুসন্ধান ও সাহসী প্রতিবেদনের কারণে তা ব্যর্থ হয়। এ কারণে এসপির রোষানলে পড়েন সাংবাদিকরা। শাস্তিমূলক বদলী হওয়ার শেষ দিনে বিভিন্ন থানার ওসিকে দিয়ে ফেনীর ৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুরনো নাশকতার মামলায় চার্জশীট দাখিল করান এসপি। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সিনিয়র ৪ সাংবাদিক প্রথমে হাইকোর্ট থেকে এবং পরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে থেকে স্থায়ী জামিন লাভ করেন। চার সাংবাদিক হচ্ছেন ফেনীর সময়ের সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, বাংলা নিউজের জেলা প্রতিনিধি সোলায়মান হাজারী ডালিম, দৈনিক সময়ের আলোর স্থানীয় প্রতিনিধি মাইন উদ্দিন পাটওয়ারী ও দৈনিক অধিকার এর প্রতিনিধি এস এম ইউসুফ আলী।
যুগান্তরের চাপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ও যমুনা টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার মনোয়ার হোসেন জুয়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেন চাপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের এমপি’র ভগ্নিপতি এডভোকেট আনোয়ার। একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে ক্ষুব্ধ হয়ে এমপি’র পক্ষে ওই মামলাটি করা হয়েছে। সূত্র : যুগান্তর, ২৬ আগস্ট।
৮ আগস্ট চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার ওসি নেয়ামত উল্লাহ কালের কন্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধি আয়েশা ফারজানাকে নাজেহাল করেন। সূত্র : কালের কন্ঠ, ৯ আগস্ট।
দৈনিক যুগান্তরের সাংবাদিক রেজাউল করিম প্লাবনকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। চাঁদা না পাওয়ায় মোবাইল ফোনে তাকে এই হত্যার হুমকি দেয়া হয়। নিরাপত্তা বিবেচনায় এ বিষয়ে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় জিডি করেছেন তিনি। এ বিষয়ে রেজাউল করিম প্লাবন বলেন, কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে মাসুম বিল্লাহ নামে একজন সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন থেকে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। কিছুদিন ধরে মাসুম বিল্লাহ ও তার সহযোগী মামুন প্লাবনের পরিবারের লোকজনদের হয়রানি করছে। বাসায় গিয়ে বিনা কারণে শাসিয়ে আসছে। এ নিয়ে মাসুম বিল্লাহ প্লাবনকে ফোন দিয়ে ২৩ আগস্ট অকথ্যভাষায় গালিগালাজ করে ও হত্যার হুমকি দেয়।
৪ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরের বরিশাল ব্যুরোর রিপোর্টার তন্ময় তপুকে কুপিয়ে হত্যার হুমকি দেয় এক দল যুবক। একটি সংবাদের জেরে স্থানীয় অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে পথরোধ করে সরাসরি এ হুমকি দিলে তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে রক্ষা পান।
বগুড়ার ধুনট মডেল প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও যায় যায়দিন পত্রিকার প্রতিনিধি সাংবাদিক ইমরান হোসেন ইমনকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় শ্রমিক লীগ সভাপতি ফারায়েজুল ইসলাম ইজলু।
হামলা, মামলা ছাড়াও পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকরা বাধা ও হুমকির মুখে পড়েছেন এ সময়ে। আগস্ট মাসের ৪ তারিখে লন্ডনে প্রবাসীদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল লন্ডনে কর্মরত বাংলাদেশী সাংবাদিকদের। কিন্তু শেষ মুহুর্তে কোন কারণ না জানিয়ে সব সাংবাদিকদের অনুষ্ঠান স্থল থেকে বের করে দেয়া হয়। এ নিয়ে বিক্ষুদ্ধ সাংবাদিকরা প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সংবাদ বর্জনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়।
রাজধানীসহ সারাদেশে মহামারিরূপে ডেঙ্গুর বিস্তারের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন করে ধমক খেতে হয়েছে সাংবাদিককে। তীব্র সমালোচনার মুখে মালয়েশিয়া থেকে দেশের আসার পর ১ আগস্ট সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়ে ক্ষেপে যান স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক। ধমক দিয়ে প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে থামিয়ে দেন মন্ত্রী।
২০ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন তাঁর অফিসে এক আদেশ জারি করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। সিটি কর্পোরেশনের কোন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না বলে তিনি জানিয়ে দেন। কেবল মেয়র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে তিনি আদেশে উল্লেখ করেন। মশার ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্বৃত করে রিপোর্ট করার পর এই আদেশ জারি হয়।
রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালামাল ক্রয়ে দুর্নীতির বিষয়ে রিপোর্টের ক্ষেত্রে লিমিটের মধ্যে থাকার জন্য সতর্ক করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। ১৫ আগস্ট রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, আপনারা অনুগ্রহ করে লিমিটের মধ্যে থাকবেন।
সিরাজগঞ্জের সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুল হত্যার অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য থাকলেও আগস্ট মাসে দু’দফা তা পিছিয়েছে। বহুল আলোচিত সাগর-রুনী হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখও এ মাসে আরেকবার পিছিয়েছে আদালত।
এদিকে ৮ আগস্ট ইটিভির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৩২ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুদক মামলা দায়েরের সুপারিশ করে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফটো সাংবাদিক শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে কিশোর আন্দোলনের সময় করা ৫৭ ধারার মামলার ১৮ আগস্ট আপীল বিভাগ স্থগিত করে।
না ফেরার দেশে যারা :

আগস্টে কয়েকজন সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, লেখক ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী মিজানুর রহমান শেলী ইন্তেকাল করেন ১৪ আগস্ট। চাপাইনবাবগঞ্জের সিনিয়র সাংবাদিক, কালের কন্ঠের জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক যুগান্তর ও আমার দেশ এর সাবেক জেলা প্রতিনিধি ফেরদৌস সুইট ১৫ আগস্ট আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরন করেন। ১ আগস্ট ইন্তেকাল করেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের রংপুর জেলা প্রতিনিধি শাহজাদা মিয়া আজাদ।