‘পাবনার রায় শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই নয়, প্রতিহিংসামূলকও’

নিজস্ব প্রতিবেদক: দলীয় প্রতীক ছাড়া আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এ প্রসঙ্গে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে বিএনপির যেসব নেতাকর্মী বা যারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন, তারা কেউ চাইলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু প্রতীক সেক্ষেত্রে আমরা বরাদ্দ দেবো না।’শুক্রবার (৫ জুলাই) সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে বেলা ৪টা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু হয়ে ৬ পর্যন্ত চলে। বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্ত ছিলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা এখনও মনে করি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতীক ব্যবস্থা তুলে নেওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয়দের প্রতীক ছাড়াই নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে বিএনপির কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে করতে পারবে। তবে আমরা মার্কা বরাদ্দ করবো না।’

এখনও স্থানীয় সরকারের পুরো ইউপি নির্বাচনের শিডিউল আসেনি উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এরমধ্যে বিভিন্নভাবে আমাদের নেতাকর্মীরা জানতে চাচ্ছেন এখানে দলের অবস্থান কী হবে? ইতোপূর্বে যখন পার্টির প্রতীক দিয়ে নির্বাচন করার প্রশ্ন এসেছিল, তখনই আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম। বলেছিলাম, পার্টির প্রতীক দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করাটা বাংলাদেশের জন্য উপযোগী হবে না। এটি বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করবে রাজনীতির ক্ষেত্রে।’

বরগুনার রিফাত হত্যা মামলার আসামি নয়ন বন্ডকে হত্যা করা হয়েছে আসল মদতদাতাদের আড়াল করতেই বলে দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘রিফাত হত্যার পর যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটা বাংলাদেশের আইন-আদালত ও রাষ্ট্রের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশ করা হয়েছে। রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আসল মদতদাতা যারা তাদের আড়াল করা। তারা যেন আপনার আলোচনায় না আসতে পারে, সেজন্য এটা করা হয়েছে।’

নয়ন বন্ডকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘কয়েকদিন আগে দেখেছেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গত ৬ মাসে ৪৩৮ জনকে ক্রসফায়ার ও এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। গতকাল সম্ভবত আদালতে একটা আদেশ এসেছে, সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে তাদের জানাতে। এর আগে হাইকোর্টের একটা আদেশ ছিল, কোনোমতে বিচারবহির্ভূত হত্যা করা যাবে না। এটি সম্পূর্ণ আইন পরিপন্থী। আইনের শাসন ও সংবিধান পরিপন্থী।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের যে কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ করেছে, এই ফলের মধ্য দিয়ে এটি প্রমাণিত হয়েছে, এই নির্বাচন (একাদশ নির্বাচন) কতটা প্রহসন ছিল। প্রায় ২১৩ কেন্দ্রে শতকরা ১০০ ভাগ ভোট পড়েছে, ১৫০০ উপরে ভোটকেন্দ্রে শতকরা ৯৫-৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে। যেটা অসম্ভব ব্যাপার। এটা বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে কখনোই সম্ভব নয়।’

পাবনার আদালতের রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘২৪ বছর পরে নিম্ন আদালতে যে রায় দেওয়া হয়েছে, এতে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ও বিক্ষুব্ধ হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং পুরোপুরি প্রতিহিংসামূলক রায় হয়েছে এটি। যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল, সেই ঘটনায় গুলির আওয়াজ শোনা গিয়েছিল, কিন্তু কেউ হতাহত হয়নি। সেই গুলির আওয়াজ সম্পর্কেও একজন খুব পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি এর আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তিনি রেন্টু। তার ‘আমরা ফাঁসি চাই’বইতে তিনি বলেছিলেন, এটি একটি সাজানো ব্যাপার ছিল, তৎকালীন আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা ছিল।’’

এই ধরনের রায় নজিরবিহীন দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই ধরনের রায় শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই নয়, প্রতিহিংসাপরায়ণও। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তারা এতটুকু ন্যায় বিচারও পায়নি। যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তারা সবাই বিএনপির স্থানীয় বা অঙ্গসংগঠনের লোকজন। পরিষ্কার করে বলতে চাই, এ রায়ে যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, দলের পক্ষ থেকে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৪ সালে পাবনার ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনার ট্রেনে হামলার মামলায় গত বুধবার (৩ জুলাই) ৯ জনের ফাঁসি, ২৫ জনের যাবজ্জীবন ও ১৩ জনের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন পাবনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত।