শিরোনাম :

  • শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৯

মানুষ গুম হয় কেন এবং কারা করে?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : সুদান সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল আহমদ আবদ ইবনে আউফ। নাম শুনেছেন হয়তো। দেশটির সাবেক প্রতাপশালী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালে স্বৈরশাসক ওমর আল বাশির তাঁকে জেলখানায় নিক্ষেপ করেন। শুধু তাই নয় ২০০৮ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন বলে সরকারিভাবে প্রচার করা হয়। সম্প্রতি এক মসজিদের ভূগর্ভস্থ কারাগার থেকে সুদানের সাবেক প্রভাবশালী এ মন্ত্রীকে জীবিত তবে কঙ্কালসার অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বলে জানা গেছে। ছবিতে যেভাবে আউফকে দেখা গেছে তাতে তাঁকে সেদেশের সাবেক সেনাপ্রধান কিংবা প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে চিনবার তেমন উপায় নেই। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে বক্তৃতা দেয়া অবস্থার ছবির সঙ্গে সদ্য ভূগর্ভস্থ গোপন কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে উদ্ধার করা আহমদ আবদ ইবনে আউফের ছবি মেলালে কিছুটা মিল পাওয়া যায়। অবশ্য উদ্ধারকৃত লে. জেনারেল আউফের ছবিটি নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। কারণ দুর্ভিক্ষ কবলিত ক্ষুধার্ত মানুষের ছবির সঙ্গে আউফের ছবিও কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেঁটে দিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে হয়েছে। এরকম কারসাজি আজকাল অনেকেই করছেন।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কত করুণ কাহিনী ছড়িয়েছিটিয়ে আছে। এসবের কটাইবা আমরা জানি! তবে এটা নিশ্চিত যে, ক্ষমতার হাতবদলের ইতিহাস প্রণীত হয় ক্ষমতাধরদের কঙ্কাল দিয়েই। আবার কোনও না কোনও ক্ষমতাধরের কঙ্কালের সিঁড়ি বেয়েই অনেককে বসতে হয় মসনদে। টিকে থাকতে হয় প্রাণান্ত কসরত করেই। এমন উদাহরণ পৃথিবীতে অনেক। এমনকি আমাদের দেশেও এর উদাহরণ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ওমর আল বাশিরও সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সুদানের কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। এখন বুঝছেন ক্ষমতা হারাবার মর্মজ্বালা কত বেদনার এবং অশ্রুময় হয়ে উঠতে পারে। দেশটির এমন ইতিহাস থেকে কি বিশ্ব ক্ষমতাবানদের শেখবার কিছুই নেই? অবশ্যই আছে। তবে তা কেউ শেখেন না। শেখতে চানও না। কারণ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে ক্ষমতায় আরোহন দুষ্কর হয়ে পড়ে। ‘টেস্ট অব পাওয়ার’ অনুভব করা যায় না। ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই প্রায় সব ক্ষমতাসীনই ইতিহাসের শিক্ষা ভাগাড়ে ছুঁড়ে মারেন। স্বৈরশাসক হলেতো এছাড়া কোনও পথই অবশিষ্ট থাকে না।
এতো গেল আফ্রিকা মহাদেশের সংঘাত-সংঘর্ষময় সুদানের কথা। পৃথিবীর আরও অনেক দেশেই এমন রাজনৈতিক হত্যা, গুম ও খুনের এন্তার ঘটনা ঘটছে অহরহ। আগেও ঘটেছে। এখনও ঘটছে। সাবেক ক্ষমতাধর অনেক নেতা-নেত্রীকেও প্রহসনমূলক বিচারকার্যের মাধ্যমে জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পচিয়ে ফেলা হচ্ছে। এমনকি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার নির্মম ইতিহাসেরও অন্ত নেই।
জলজ্যান্ত কোনও মানুষ হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যাবে বা গুম হবে তা ভাবাও যায় না। মানুষ জন্ম নিলে মারা যাবে, অসুখবিসুখ হবে, তাতো স্বাভাবিক। কিন্তু অসুখ নেই, কোথাও কোনও কাজে যাওয়া নেই। আকস্মিকভাবে কারুর হাওয়া হয়ে যাওয়া সহজে কেউ মেনে নিতে পারে না। এতে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়। হাহাকার এবং গুমোট অবস্থার সূচনা হয় কেউ গুম হয়ে গেলে। পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার। কেউ মরে গেলে, দুর্ঘটনা ঘটলে তার লাশ পাওয়া যায়। আহত অবস্থায় পাওয়া যায় দুর্ঘটনার শিকার হতভাগ্য মানুষটিকে। কিন্তু গুম হলে, নিখোঁজ হলে কাউকে আর পাওয়া যায় না। কোনও খোঁজ মেলে না হারানো বা গুম হওয়া ব্যক্তিকে। তাই কান্নার রোল পড়ে গুম হওয়া লোকটির বাড়িতে। তার আপন-জন, মা-বাবা, ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, স্ত্রীপরিজন সারাজীবন কাঁদে। হাহাকার করে। গুম হওয়া মানুষের পরিবারগুলো অনেকদিন ধরে কাঁদে। অশ্রু বিসর্জন দেয়। কিন্তু গুম হওয়া লোকটি আর ফেরে না। এর চাইতে বেদনা ও কষ্টের আর কিছু থাকে না গুম হয়ে যাওয়া পরিবারটির জন্য। এমন গুমের ঘটনা ঘটছে দেশেদেশে। বাড়িতে বাড়িতে। পরিবারে পরিবারে। কিন্তু কেন, কারা এবং কেন ঘটাচ্ছে গুমের এসব নির্মম ঘটনা? জানেন কেউ? হয়তো জানেন। কিন্তু বলেন না। প্রকাশ করেন না। জানালে, প্রকাশ করে দিলে বিপত্তি ঘটতে পারে। অপরাধ জানাজানি হয়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বিপদে পড়তে পারে, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর লোকজন তৎপর হলে অপরাধীরা পাকড়াও হতে পারেন। আইনআদালতে সোপর্দ হতে পারেন। তাই গুম-খুনের ঘটনা চেপে যাওয়া হয়। চেপে রাখা হয়। কাউকে জানতে দেয়া হয় না।
গুম ও খুন সবাই হয় না। কেউ কেউ হয়। কেউ কারুর প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিপক্ষ থাকলে খুন হয়। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হলে গুম হতে পারে। রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এমনকি কেউ ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ হলেও গুম কিংবা খুন হতে পারে অনেকে। কেউ কারুর পথের কাঁটা হলেও তাকে সরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হয়। পরীক্ষায় বারবার ভালো রেজাল্ট করছে কেউ। তার জন্য আরেক জন ফার্স্ট হতে পারছে না। বারবার সেকেন্ড হচ্ছে। এরজন্যও প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে ক্লাসমেটকে গুম করা হয়। নির্বাচনে কেউ বারবার জিতছে। আরেকজন ভোট পাচ্ছে না। হেরে যায় বারবার। এজন্যও জনপ্রিয় প্রার্থীকে চিরকালের জন্য বিদায় করে দেয়া হয় নির্মমভাবে। কারুর কোনও প্রেম-ভালোবাসার প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও গুম করা হয় কাউকে কাউকে। কারুর ঘোরতর অপরাধ সম্পর্কে কেউ কিছু জানলেও তার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। কখন গুম হতে পারে অপরাধের তথ্য জানা লোকটি তা বলা মুশকিল! অর্থাৎ প্রতিনিয়ত মানুষের জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। বিশেষত যারা রাজনীতি করেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী কেউ, তাদের নিরাপত্তা বেশি অনিশ্চিত। গুম, খুন বা নিখোঁজ হবার আশঙ্কা তাদেরই বেশি।
আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সমাজের প্রভাবশালী কিংবা বিত্তবান কারুরই নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। কখন কে গুম কিংবা খুন হন তা কেউ বলতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলতে পারেন না।
মসজিদ, মন্দির, গির্যার মতো উপাসনার জায়গাতেও মানুষ নিরাপদ নয়। এইতো কিছুদিন আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ ও শ্রীলঙ্কার গির্যায় যে মর্মান্তিক হত্যালীলা চালানো হলো তা যেমন নজিরবিহীন, তেমনই হৃদয়বিদারক। শ্রীলঙ্কার আবাসিক হোটেলেও মানুষ হত্যা করা হয়েছে। তবে হত্যাকা-ের শিকার হওয়া লোকদের লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু গুম হওয়াদের লাশ পাওয়া যায় না। এদের মৃতদেহ কিংবা জীবিত পাবার জন্য আপনজনেরা বছরের পর বছর খোঁজাখুঁজি করেন। কিন্তু পান না গুম বা নিখোঁজ হওয়া আপনজনকে। শুধু আশা কুহকের পেছনে ঘোরেন। কিন্তু কোনও লাভ হয় না।
বিএনপির ওয়ার্ড কমিশনার শাহ আলম গুম হয়েছেন। তাঁকে পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলী ঢাকার রাস্তা থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁকেও আর পাওয়া যায়নি। ইলিয়াসের স্ত্রী-সন্তানরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছেন। বারবার তাদের আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়েছে। ইলিয়াসকে খুঁজে বের করে দেবার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের বড়ছেলেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকে একদল লোক এসে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁকে আর ছেড়ে দেয়া হয়নি। তিনি কোথায় পরিবার জানে না। অথচ তিনি সেনাবাহিনীর বড় অফিসার ছিলেন। কী তাঁর অপরাধ? আরেক জামায়াতে নেতা মির কাশেম আলীর আইনজীবী ছেলেকে ধরে নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেয়া হয়নি। কেন? তাঁদের কোনও অপরাধ থাকলে তা জনগণ ও তাঁদের পরিবারকে জানানো হোক। অপহৃতদের কোথায় রাখা হয়েছে এবং কী তাঁদের কসুর তা জানিয়ে ন্যায়বিচার করা হোক। এভাবে জলজ্যান্ত মানুষদের অপহরণ করে গুম করে দেবার অধিকার কারুর নেই। একইভাবে বিএনপি-জামায়াতের আরও অনেক নেতা-কর্মী নিখোঁজ ও গুম হয়েছেন। তাঁদের কোনও খোঁজ মিলছে না। নিজদেশের নাগরিকদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার কেড়ে নেবার এমন দুর্বিনীত দুঃসাহস কার?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে আইনজীবীসহ ৭ জনকে ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে রাখা হয়। কয়েক দিনপর তাঁদের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যগ্রুপ। অপরাধীরা চিহ্নিত হয়। নিহতদের পরিবারগুলো নিশ্চয়ই ন্যায়বিচার পাবে বলে মনে হয়। দেশবাসী চেয়ে আছে এই সেভেন মার্ডারের শেষ পরিণতি দেখতে। তবে অপরাধীরা খুব শক্তিশালী। তারা হয়তো শেষকামড় বসাতে চাইবে। কিন্তু আমরা আইন ও ন্যায়বিচারের হাতকে অনেক লম্বা মনে করি। তাই অপরাধীরা যতো শক্তিধরই হোক, ওদের উপযুক্ত সাজা হবেই ইনশা আল্লাহ।
কোনও নাগরিক অন্যায় অপরাধ করলে তাঁর আইনানুগ বিচার হতেই পারে। সাজা হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু রাতের আঁধারে অপহরণ করে নিয়ে খুন ও গুম করা ভয়াবহ অপরাধ। আমাদের প্রিয়দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে গুম-খুন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। প্রতিপক্ষকে রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে গুম কারা এবং কেন করছে তা মোটামুটিভাবে সবাই বোঝেন। অপরাধী কারা তাও সংশ্লিষ্টদের জানা। কিন্তু গুম-খুনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাও সীমিত হয়ে যাচ্ছে। এটাই দুর্ভাগ্যজনক। অমানবিক এবং অপ্রত্যাশিত। পাশবিকও। এভাবে সমাজ, জাতি বা দেশ চলতে পারে না। এর আশু পরিসমাপ্তি প্রয়োজন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট