মার্কিনীরা কি অকৃতজ্ঞ জাতি?

আহমেদ ফয়সাল ▪ ডিয়ার বাংলাদেশী আম্রিকান, আজ 4th of July, ইউএস ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডে। চলেন সবাই মিলে আম্রিকানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে আসি। আমাদের যতগুলি দল আছে, কমিউনিটি অর্গানাইজেশন আছে, সবাই মিলে ঠিক বাংলাদেশের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডে’র মত লাইন দিয়ে বড় বড় ফুলের তোরন দিয়ে ওয়াশিংটনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসি। সেটা যদি না পারেন, তাইলে চলেন দেখে আসি এই বিশেষ দিনটিতে আম্রিকান’রা কিভাবে কোন পদ্ধতিতে
জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

আর সেটাও যদি না পারেন, তাইলে চলেন এই বেয়াদব ও অকৃতজ্ঞ জাতিকে একটা চরম শিক্ষা দিয়া আসি, বেটারা জানেনা কেমন করে স্বাধীনতার স্থপতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয়।

উচিৎ ছিলো জুলাই মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সকল রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলি শুধু ওয়াশিংটনের জয়গান গাইতে থাকবে। আর আজ 4th of July’তে তো সকাল থেকেই বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ওয়াশিংটনের প্রতিকৃতি বানিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে দিবে। কিন্তু মার্কিনীরা তার কিছুই করতেছেনা! এইটা চরম বেয়াদবি। জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা ও অকৃতজ্ঞতা!

এই অশ্রদ্ধা দেখে এলাম ওয়াশিংটন ডিসি’তেও।
ডিসি’তে টমাস জেফারসন ও আব্রাহাম লিংকনের নামে বিশাল এলাকাজুড়ে জেফার্সন ও লিংকন মেমোরিয়াল এবং মিউজিয়াম বানিয়ে রাখছে। সে তুলনায় জর্জ ওয়াশিংটনের নামে ক্যাপিটাল সিটির নামকরণ, একটা লাইব্রেরী ও মামুলি দুই/একটা রোডের নাম ছাড়া তেমন কিছুই পেলাম না।

আজও গুলোলে সার্চ দিয়ে আবার দেখার চেষ্টা করলাম, ‘Who is the founding father of the United States’??

গুগোলে যা পেলাম তাতে আমি আরো হতাশ!
সারা দুনিয়া জানে যে, জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে আম্রিকা স্বাধীন হইছে। কিন্তু গুগল বলতেছে, আম্রিকার একক কোনো জাতীর পিতা নেই, তবে গ্রপ অব পিপল আছে, যাদের নেতৃত্বে আম্রিকা স্বাধীন ও সুপ্রতিষ্ঠিত হইছে। আর সেখানে যাদের নাম আছে, তাদের মাঝে জর্জ ওয়াশিংটনের নামটা পেছনের দিকে।

The Founding Fathers of the United States, or simply the Founding Fathers, were a group of leaders who united the Thirteen Colonies, led the war for independence from Great Britain, and built a Frame of Government for the new United States of Americaupon republican principles during the latter decades of the 18th century.’………

ভাইরে, সত্য কথা হইলো, বিশ্বে কারো একক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়না। একক নেতৃত্বের চিন্তা আসে ডিক্টেটরশীপ থেকে। মার্কিনীদের কাছে ওয়াশিংটনের চেয়ে আব্রাহাম লিংকনের গুরুত্ব অনেক বেশী। মার্কিন পাঠ্যপুস্তকেও সেই গুরুত্ব বিদ্যমান। তাই বলে জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতি তারা অশ্রদ্ধা ভাবেনা।

জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতি মার্কিনীদের শ্রদ্ধা হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। ডান হাত যখন বুকে চেপে ন্যাশনাল এন্থিম গায়, তখন তারা ওয়াশিংটনকেই আগে স্মরণ করে। স্কুলগামী শিশুরাও এটা জানে।

টমাস জেফার্সন, আইজেনহাওয়ার, নিক্সন, জন এফ কেনেডিকেও জর্জ ওয়াশিংটনের চেয়ে কম গুরুত্ব দেন না মার্কিনীরা। একজনকে গুরুত্ব দিলে আরেকজনের প্রতি গুরুত্ব কমেনা। শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আইন করে চাপায়ে দেয়ার জিনিস না। শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আসে হৃদয়ের গভীর থেকে।

কিন্তু আমরা একজনকে আসমানে উঠাতে অন্যদের পাতালে পুতে ফেলি, এইটাই আমাদের প্রব্লেম। একজনকে সুপার ইম্পোজ করতে গিয়ে আরেকজনকে চাকরবাকর বানিয়ে দেই।

আমরা অনেক কিছুতেই ইউরোপ আমেরিকার উদাহরণ দেই। কিন্তু তাদের থেকে আসল শিক্ষা আমরা কখনোই নেইনা। মার্কিন ডলার বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। সেই ডলারগুলি খেয়াল করে দেইখেন, একক কোনো নেতার পিকচার দিয়ে ডলার তৈরী হয় না। একেক নোটে একেক নেতার পিকচার।

এই মার্কিন মুল্লুকে আমরা ৪/৫ লাখ বাংলাদেশী বসবাস করি। এই বাঙ্গালীরা এই দেশেই খাই, এই দেশের পড়ি, এই দেশে হাগি, এই দেশে মুতি, আর দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখাইতে দেশীয় রাজনীতির কোন্দল হানাহানি মারামারি দলাদলি গ্রুপিং সব আমদানি করি।
দেশের মানুষের কথা বাদ দিলাম; এই আমরাই বা মার্কিন মেইন্সট্রিম থেকে কি শিখছি?
কমিউনিটিকে ডিভাইডেশনের রাজনীতি আর কতদিন জিয়ায়ে রাখবেন?
আলতু ফালতু দিবস কমিয়ে মূলধারায় ফিরে আসুন, কাজে লাগবে। যে দেশটা থেকে অনেক কিছু প্রাপ্তির আশা করেন, তেদেরও কিছু পাবার হক আছে।

মূলধারা আপনাদেরকে ডিভাইডেশনের রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করবে। কেননা এরা কে ঘোষক, আর কে নায়ক, কে রাজাকারের পুতি, আর কে মুক্তিযুদ্ধের ১০ম প্রজন্ম; তা নিয়ে ডিভাইডেশনের শিক্ষা পায় নি।
হিংসা বিদ্বেষ ও কুশিক্ষা নিয়ে কোনো দেশ কখনোই এগুতে পারে না।

▪লেখক: আহমেদ ফয়সাল, ক্যালিফোর্নিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ও কমিউনিটি নেতা