ফ্যাসিস্টবিরোধী জাতীয় ঐক্যকে শক্তিতে পরিণত করতে হবে – সালাহউদ্দিন
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কিছু আন্তর্জাতিক মডেল
প্রকৌশলী মেহেদী হাসান সাকী:
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তাকে বিপ্লবী ম্যান্ডেট বনাম আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষার দ্বন্দ বলা যায়।
এই অচলাবস্থাকে আমরা জনগনের গাঠনিক ক্ষমতা (Constituent Power) এবং গঠিত শক্তি (Constituted Power)- সংসদ, আদালত ও আইনের মধ্যকার তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসাবেও দেখতে পারি।
Constituent Power বা গাঠনিক ক্ষমতা বলতে সংবিধান প্রণয়ন, রহিতকরণ বা রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের সেই মৌলিক ক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে যা অন্য কোনো আইনী শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ । সুতরাং, মালিক যখন সরাসরি কোনো রায় (গণভোট) দেন, তখন তা যে কোনো প্রতিষ্ঠানের (সংসদ বা আদালত) সিদ্ধান্তের চেয়ে নৈতিকভাবে ঊর্ধ্বে থাকে। তাই সংবিধান মানলেও জনতার রায়ই শেষ কথা।
বর্তমান সংসদ সংবিধানের অধীনে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান বা গঠিত শক্তি (Constituted Power)। কোনো গঠিত শক্তি তার স্রষ্টা অর্থাৎ জনগণের (Constituent Power) সরাসরি ইচ্ছার উপরে স্থান পেতে পারে না এই দ্বন্দ্বের মূলে যাওয়ার আগে আমাদের বর্তমান অচলাবস্থার সমাধানে কিছু আন্তর্জাতিক উদাহরণ দেখতে পারি।
আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক ইতিহাসের আলোকে, বিপ্লবী ম্যান্ডেট বা আমূল রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ও সফল মডেল রয়েছে। এগুলো ঐতিহাসিক বিরতি বা বিপ্লবের পর কীভাবে আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো গড়া যায়, তার দিকনির্দেশনা দেয়। প্রধান উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. দক্ষিণ আফ্রিকা – দ্বি-স্তর বিশিষ্ট রূপান্তর মডেল (১৯৯০-১৯৯৬): দক্ষিণ আফ্রিকার মডেলকে বিপ্লবী ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয় । সেখানে রূপান্তরটি হয়েছিল দুই ধাপে। প্রথমে একটি অ-নির্বাচিত বহু-দলীয় ফোরাম ১৯৯৩ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান তৈরি করে, যা মূলত একটি সেতু (Bridge) হিসেবে কাজ করেছিল।
দ্বিতীয় ধাপে, ১৯৯৪ সালে নির্বাচনের পর নির্বাচিত সাংবিধানিক পরিষদ চূড়ান্ত সংবিধান তৈরি করে । অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানে ৩৪টি মৌলিক মূলনীতি (Constitutional Principles) অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা চূড়ান্ত সংবিধান তৈরির সময়ে বাধ্যতামূলকভাবে মানতে হয়েছিল। এছাড়াও, একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক আদালত নিশ্চিত করেছিল যে, চূড়ান্ত সংবিধান ওই মূলনীতিগুলো লঙ্ঘন করছে না।
২. কলম্বিয়া: -বিচারিক সক্রিয়তা ও সেভেন্থ ব্যালট মডেল (১৯৯১): এই উদাহরণ সবচেয়ে ক্লাসিক এবং ইন্টারেস্টিং। কলম্বিয়ার ইতিহাসে সেভেন্থ ব্যালট (Séptima papeleta) বা সপ্তম ব্যালট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দেশটিতে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান (১৯৯১ সালের সংবিধান) প্রণয়নের পথ প্রশস্ত করেছিল।
সে সময় ভোটাররা সিনেট, হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস, গভর্নর, মেয়রসহ ছয়টি ভিন্ন পদে ভোট দিচ্ছিলেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ছাত্র ও নাগরিক সমাজ একটি সপ্তম ব্যালট বা একটি অতিরিক্ত কাগজ ব্যালট বাক্সে জমা দেওয়ার আহ্বান জানায়। তারা এই অতিরিক্ত সপ্তম ব্যালট (Seventh Ballot) ফেলে সংবিধান সংস্কারের দাবি জানায়, যা তাত্ত্বিকভাবে অসাংবিধানিক ছিল । তবে কলম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্ট জনগণের এই প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটকে গাঠনিক ক্ষমতা (Constituent Power) হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং গণভোটের আইনি বৈধতা প্রদান করে । এর মাধ্যমে ১৮৮৬ সালের পুরনো সংবিধান বাতিল করে একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হয় ।
৩. ভারত-মৌলিক কাঠামো (Basic Structure) মডেল: ভারত তার গাঠনিক ক্ষমতা ও গঠিত শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে একটি অনন্য বিচারিক মডেল তৈরি করেছে ।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক কেশবানন্দ ভারতীমামলায় রায় দেয় যে, সংসদের (গঠিত শক্তি) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকলেও তারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (Basic Structure) ধ্বংস করতে পারবে না । এটি মূলত জনগণের আদি গাঠনিক আকাঙ্ক্ষাকে রক্ষা করে এবং সংসদীয় স্বৈরাচার রোধে একটি স্থায়ী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে ।
৪. কেনিয়া – বিশেষজ্ঞ কমিটি ও গণভোট মডেল (২০১০): কেনিয়া দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। সেখানে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি (Committee of Experts) খসড়া তৈরি করে, যা পরে জাতীয় সংসদ এবং সবশেষে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয় । আদালত সেখানে রায় দিয়েছিল যে, সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের জন্য কেবল সংসদ যথেষ্ট নয়, জনগণের সার্বভৌম গাঠনিক ক্ষমতার প্রয়োগ (গণভোট) অনিবার্য ।
কিছু ব্যর্থতার উদাহরণ:
এই সাফল্যের বিপরীতে ভেনিজুয়েলা (১৯৯৯) ও ইকুয়েডরের (২০০৮) মডেলগুলো বিপ্লবী ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। এই দেশগুলোতে গাঠনিক ক্ষমতার দোহাই দিয়ে আদালত ও সংসদকে পাশ কাটিয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে কুক্ষিগত করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত দেশগুলোকে হাইব্রিড বা পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।
আমার দেয়া উদাহরণ গুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া (কলম্বিয়া/কেনিয়া), একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো ব্যবহার করে সমঝোতা করা (দক্ষিণ আফ্রিকা) এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে সংস্কারের সীমা নির্ধারণ করা (ভারত)]।
বাংলাদেশে বর্তমান জুলাই জাতীয় সনদ এবং এর গণভোটের রায় বাস্তবায়নে এই মডেলগুলো গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশক হতে পারে।
লেখক: তরুণ সংগঠক ও বিশ্লেষক

