শিরোনাম :

  • রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৯

‘মাজার আছে ব্যবসা নেই’

সৈয়দ শামছুল হুদা, তুরস্ক থেকে ফিরেঃ
ঐতিহ্য আর গৌরবময় ইতিহাসের এক বিশাল সমাহার নিয়ে বিশ্বের বুকে আজো বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইস্তাম্বুল। ইসলাম-বোল থেকে যার উৎপত্তি, সেই ইস্তাম্বুলে আজ সত্যিই ইসলামের সুবাতাস বইছে। বিগত প্রায় ৭০/৮০বছরের ইসলাম বিরোধী গভীর চক্রান্তের জাল ভেদ করে আবারো ফিরে আসছে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। তুরস্কের আজান, তুরস্কের নামায, তুরস্কের সংস্কার কার্যক্রম সবকিছুই যেন অন্যরকম বাতাস বইয়ে দিচ্ছে। আযানের সুর হৃদয়ের গভীর কোণে এমনভাবে আঘাত হানে, মনে হয় এই বুঝি আজানের প্রথম ধ্বনি উচ্চারিত হলো। তুরস্কের প্রতিটি মসজিদের আজানে অন্যরকম সুর রয়েছে, আবেদন রয়েছে। এতটা হৃদয়কাড়া আজান আর কোথাও শোনা যায় না। ইস্তাম্বুলের পাহাড়ের পাদদেশে আজানের সুর যেন ঢেউ খেলে যায় বসফরাসের অনন্ত প্রবাহের মতোই।

সেই তুরস্কে বেশ কয়েকটি মাজার জিয়ারত করার তৌফিক হয়েছে। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা. এর মাজার, বিশ্বকবি, প্রেমের কবি জালাল উদ্দীন রোমি রহ. এর মাজার, শামসুদ্দিন তিবরিজী রহ. এর মাজার, হযরত ইউশা আ. এর মাজার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে, শিরিক, বিদআত, কুসংস্কার বলতে যা আমাদের দেশে দেখি তার কিছুই দেখিনি। সেখানে কোন মাজারেই মোমবাতি, আগরবাতি, ফৈতা, লালগিলাফ, সবুজ গিলাফ এর জমজমাট ব্যবসা দেখিনি। আশে-পাশে কোন নকল মাজারও গড়ে উঠেনি। এটা- দাদা হুজুরের মাজার, এটা রোমী রহ. নাতি হুজুরের মাজার, এটা সাহেবজাদা হুজুরের মাজার এসবও ওখানে দেখিনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে সেখানে শুধুস্মৃতিটা ধরে রাখার জন্য যতটুকু করার দরকার, সেইভাবে নিরাপত্তার সাথে তা করে রাখা হয়েছে। একটি মাজারের স্মৃতিটুকুই শুধু এখানে আছে। এর বাইরে কিছু নেই।

আমাদের দেশে মাজারের রমরমা ব্যবসা। এখানে আগরবাতি দিতে হবে, মোমবাতি দিতে হবে। কিছুদিন পরপর নতুন গিলাফ ছড়াতে দান- খয়রাত আদায় করতে হবে। গিলাফে ভরে টাকা তোলার হিড়িক পড়ে যায়। এসব কিছুই নেই তুরস্কের উপরোক্ত কোন মাজারে। অনেকে মনে করেন, তুরস্কে সুফীবাদ প্রতিষ্ঠিত। আসলে সেখানের সুফিবাদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার ছুঁয়া রয়েছে। মানুষের মনে আল্লাহর বড়ত্ব তুলে ধরা তাদের অন্যতম চেষ্টা। তারা আল্লাহর নাম নেওয়ার সময় জুলজালাল, জুলকামাল ইত্যাদি শব্দগুলো খুব ভক্তির সাথে উচ্চারণ করে। প্রতিটি মাজারের কাছাকাছি বড় ধরণের পূরাতন মসজিদ রয়েছে। একেকজন সুলতান এসব মসজিদগুলো করে দিয়েছেন। যেমন বিশিষ্ট সাহাবী আবু আইয়ুব আল আনসারী রা. এর কবরের পাশে সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতেহ এর নির্দেশে চমৎকার একটি মসজিদ তৈরী করে দেওয়া হয়েছে। আজো সগৌরবে সেই মসজিদ রয়েছে। ইউশা আ. কবরের পাশে, জালাল উদ্দীন রোমী র. কবরের অনতিদূরে, শামসুদ্দিন তিবরিজি রহ. এর কবরের কিছুটা দূরে সুলতানদের তৈরী মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদ করেছেন সুলতান বায়েজিদ, সুলতান সেলিম প্রমুখগণ।

কোন মাজারে সিজদা দেওয়া, টাকা পয়সা দেওয়ার কোন সিষ্টেমই নেই। ইউশা আ. কবরের একপাশ দিয়ে দর্শকগণ জুতা পায়ে ঢুকছে, অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতেই যতটা সম্ভব দুআ করছে। মুনাজাত করছে। কবর জিয়ারতের যে সকল দুআ তা আদায় করছে। কেউ কোন কবরের পাশে বসে কান্নাকাটি করা, মাজারের কাছে কিছু প্রার্থনা করা, এমন কোন পরিবেশই নেই।

আমাদের দেশে এত মাজার কেন গড়ে উঠে? এর একমাত্র কারণ বিনা পুঁজির ব্যবসা। এখানে লালসালুর আসর বসে, গরু-খাসি, ছাগল মুরগির বাজার বসে। আটরশির মাঝারে গরুশালা, ছাগলশালা, উটশালা, কুত্তাশালার বিশাল বিশাল এরিয়া আছে। মানুষ এখানে ট্রাকে ট্রাকে গরু নিয়ে আসে, ছাগল, ভেড়া, উচ, মুরগী নিয়ে আসে। এদেশে কোনটা হক্কানী পীরের মাজার, আর কোনটা নকল পীরের মাজার তা পার্থক্য করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। কারণ আমাদের দেশে ধর্মপ্রাণ মানুষদের অজ্ঞতার সুযোগে এদের থেকে ব্যবসা করা খুব সহজ। এদের ধোকা দেওয়া খুব সহজ। শাহজালাল রহ, শাহপরাণ রহ. এর মাজারে নকল আশেকদের আনা-গোনা, তাদের দৌরাত্ম দেখলে আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। বার্ষিক ওরস, হিন্দুদের মতো বারো মাসে তেরো পার্বন পালনসহ কোন কিছুই বাদ যায় না।

ইস্তুাম্বুল আর কোনিয়া প্রদেশের যে সকল মাজারে গিয়েছি, সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক আসছে। শুধু তুরস্ক থেকেই নয়, সারা বিশ্বথেকে, বিশেষকরে মধ্য এশিয়া থেকে প্রচুর লোক জিয়ারতে আসে। জালাল উদ্দীন রোমী রহ. এর কবর জিয়ারতে সুবিধার জন্য সরকারীভাবে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বাস, ট্রেন সবকিছুই আছে। বিশাল জায়গা নিয়ে মাজার প্রতিষ্ঠিত। রোমী রহ.কে বুঝার জন্য, তার শাগরেদদের অবস্থা বুঝার জন্য কিছু স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে স্থির করে রাখা হয়েছে। তাঁর মাজার, তাঁর হাজার দানার তাসবীহ, তাঁর পরণের জামা, বিভিন্ন সময়ে লেখা মসনবি ইত্যাদির কপি বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা আছে। এর বাইরে কিছুই নেই।

অন্যদিকে আমাদের গোলাপশাহ মাজার, মীরপুর মাজারে যা হয় তা ইসলামের মৌলিক চেতনার সাথে কতটা সাংঘর্ষিক তা কল্পনা করেও শেষ করা যাবে না। তুরস্কের জীবন্ত পীর শায়খ মাহমুদ আফেন্দি দা.বা. এর দরবারও জেয়ারত করার তৌফিক হয়েছে। সেখানেও কোন প্রকার ভন্ডামী, আর্থিক লেন-দেন এর কোন সুযোগ নেই। কোন পরিবেশই নেই। তুরস্কে দ্বীনি কাজের মূল প্রাণকেন্ত্র হলো মসজিদ। মসজিদগুলোকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। মনের সবটুকু মাধুরী মিশিয়ে বর্তমান সরকার মসজিদগুলোকে চালু করছে। সংস্কার করছে। আধুনিকায়ন করছে। একজন মানুষ মসজিদে প্রবেশ করলে তার মন মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে আনচান করবে না। মনে হবে মসজিদে আরো একটু বসি। একটু বিশ্রাম নিই। একটু জান্নাতের বাগানে সময়টা কাটাই।

সেখানে শহীদদের স্মরণে বিশালাকারের মসজিদ করা হয়েছে। চামলিজা জামি নামে এরদোয়ান সরকার নতুন মসজিদটি করেছে। ব্লু মস্ক হিসেবে খ্যাত সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ মসজিদটি নতুন করে রূপ দেওয়া হচ্ছে। আলোকসজ্জা করা হচ্ছে। যত ইবাদত, যত প্রার্থনা সব মসজিদে। মাজারে কোন প্রার্থনা নেই। মাথা ঝুকিয়ে পড়া নেই। এগুলো দেখে খুব ভালো লাগলো। তুর্কিরা সত্যিই ইসলামী চেতনা লালন করে। তাদের দ্বারাই দ্বীনের খেদমত হবে ইনশাআল্লাহ।

# ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া
২২.০৫.২০১৯