বহু সাংবাদিক চাপ ও ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন : বৃটিশ হাইকমিশনার

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন বলেছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত হতে হবে। একই সাথে তিনি গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রশংসা করে বলেন, ১৫ বছরে এই সাফল্য যথাযত তুলে ধরা হচ্ছে না। বাংলাদেশে সাজাপ্রাপ্ত একাধিক ব্যক্তিকে বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে ব্রিটেন থেকে ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ইস্যু উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করতে পারেন না বলে জানান।

২৬ জুন বুধবার পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেনে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব হলে আয়োজিত ‘ডায়লগ উইথ জার্নালিস্টস শীর্ষক ’ অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তৃতার পর তিনি বাংলা প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্স ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। প্রেস ক্লাব প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মুহাম্মদ জুবায়েরের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে ছয়টি অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট ডিকসন বলেন, আগামী ২০২১ সালে ব্রিটেন ও স্বাধীন বাংলাদেশের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ব্রিটেন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে নতুন করে ঝালাই করে এর ভীতকে আরো সুদৃঢ় করতে চায়। আর এই সম্পর্কের অর্ধ শতাব্দী উদযাপনের জন্য ব্রিটিশ ফরেন অফিস দুই দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায় ছাড়াও ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটির সক্রিয় ভূমিকা আশা করে।

হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত হতে হবে। এক্ষেত্রে রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন বাংলাদেশে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বহু সাংবাদিক সরাসরি আমাদেরকে পেশাগত দায়িত্ব পালনে তাদের ওপর চাপ ও ঝুঁকির কথা ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি নিজেই রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের সূচকে বাংলাদেশের ১৫০তম অবস্থান উল্লেখ করে বলেন, এটা অনাকাক্ষিত। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য গ্লোবাল কনফারেন্স অন প্রেস ফ্রিডম-এ আলোচিত হবে।

হাইকমিশনার গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রশংসা করে বলেন, ১৫ বছরে এই সাফল্য যথার্থভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না। দেশটি নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। এক দেশের সাথে আরেক দেশের পার্টনারশীপেও কিছুটা ব্যবধান থাকে, ছোট-বড় ইস্যু থাকে। আমার অগ্রাধিকার হচ্ছে বাংলাদেশের সাথে ব্রিটেনের পার্টনারশীপের ক্ষেত্রে সমতা আনা। তিনি বাংলাদেশের সাথে ব্রিটেনের বাণিজ্য ঘাটতির কথা উল্লেখ করে বলেন,বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে রফতানীর পরিমাণ ৪দশমিক ১ বিলিয়ন পাউন্ড। অন্যদিকে বাংলাদেশে ব্রিটেনের রফতানী হচ্ছে প্রায় ৪শ মিলিয়ন পাউন্ড। এক্ষেত্রে ব্রিটেন যে অনেক পিছিয়ে আছে সেক্ষেত্রে সমতা ফিরিয়ে আনার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করেছেন। সেই সূত্রে ব্রিটেনের উন্নত সেবা ও পণ্যের বাজার সৃষ্টি হবে বাংলাদেশে।

এক প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার বলেন, ব্রিটেনের মাইগ্রেশন এডভাইজারি কমিটি (ম্যাক) বাইরের দেশ থেকে শেফ আনার ক্ষেত্রে যে সুপারিশ করেছে তা পরিষ্কার, তবে এ নিয়ে বিভ্রান্তি যাতে না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

বাংলাদেশে গুম-খুন এমনকি ব্রিটেন প্রবাসীকে গ্রেফতার, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, মনবাধিকার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে করা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সবখানেই যথার্থ নীতি চাই। সুশাসন চাই। বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের ভ্রমণ সতর্কতা জারির ক্ষেত্রে নেতিবাচক মন্তব্যের ব্যাপারেও কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি।

ভিসা প্রসেসিং ব্যবস্থা দিল্লীতে স্থানান্তর ও ভিসা প্রদানে হয়রানি ও বৈষম্য নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হন হাইকমিশনার। তিনি জানান, তারা প্রাপ্ত আবেদনের শতকরা ৭০ ভাগ ভিসা ইস্যু করছেন। দিল্লীতে ভিসা প্রসেসিং কার্যক্রম চললেও এতে ভারতীয়দের কোনো হাত নেই। সেখানে অবস্থিত ব্রিটিশ কর্মকর্তারাই সিদ্ধান্ত নেন। ভিসা অফিস ঢাকা ফিরিয়ে আনার কোনো সম্ভাবনা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা হলে ভিসার খরচ অনেক বেড়ে যাবে।

হাইকমিশনার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইস্যুতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সম্মেলনে এনিয়ে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ উদার ও অনন্য ভূমিকা রাখছে। এক্ষেত্রে ব্রিটেন রোহিঙ্গা কমিউনিটির প্রত্যাবর্তনের পক্ষে, তবে এটি যেনো হয় স্বেচ্ছায় এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত সাপেক্ষে। হাইকমিশনার জানান, ব্রিটেন মনে করে আরাকান এখনো নিরাপদ নয়। এছাড়া সামগ্রিকভাবে সবসময়ই বার্মার ভূমিকার নিন্দা জানাচ্ছে ইউকে। এছাড়া তিনি যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ-বাংলাদেশীদের সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে হাইকমিশনারের পরিচিতি পাঠ করেন ক্লাবের নির্বাহী সদস্য নাজমুল ইসলাম। প্রেস ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারীবৃন্দ, সিনিয়র সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ক্লাবের নির্বাহী সদস্যরা ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে ক্লাবের মনোগ্রামখচিত মগ ও ব্যাগ তুলে দেন। এদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রেস ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক চৌধুরী, এসিসটেন্ট সেক্রেটারী মতিউর রহমান চৌধুরী, কমিউনিক্যাশন্স সেক্রেটারী আবদুল কাইয়ুম, ট্রেনিং সেক্রেটারী ইব্রাহিম খলিল, ইভেন্ট সেক্রেটারী রেজাউল করিম মৃধা,নির্বাহী সদস্য আবদুল কাইয়ুম, নাজমুল ইসলাম ও পলি রহমান।