শিরোনাম :

  • শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

কৌশল-কূটকৌশলের চক্করে ত্রিশংকূল ফখরুল

মাহমুদ হাসান : শাসক শ্রেণীর সব কর্ম আর ব্যক্তি বিশেষের অতিরঞ্জিত প্রচারের চাইতেও চলমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত আর সমালোচিত ব্যক্তিটি হলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমকালীন প্রসঙ্গ ছাড়িয়েও প্রচার ও জনমাধ্যমে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে মির্জা ফখরুলকে। এটা এক বড় প্রাপ্তি এই সজ্জন রাজনীতিবিদের জন্য। নানাকৌশলে দোষক্রুটির উর্ধে রাখার চেষ্টা চলছে তাঁকে। কেউ কেউ দলটির বহিষ্কৃত মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূইঁয়ার সাথেও তুলনা করছেন মির্জা ফখরুলকে। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য, দলের চেয়ারপার্সন কারাবন্দি অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে। সিনিয়র নেতাদের অধিকাংশই ফখরুল বিরোধী। দলের মহাসচিব থাকলেও কূটকৌশলে তাঁর কাছ থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রমের ক্ষমতা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নয়াপল্টনের বিবৃতি আর সংবাদ সম্মেলন সিন্ডিকেট গ্রুপের সাথেও মির্জা ফখরুলের ফারাক চোখে পড়ার মতো। সবকিছু মিলে এক অসহায় অবস্থায় অন্যতম প্রধান এক রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের। এই অবস্থায় দলের হাল একাই বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। একারণেই তাকে উদ্ধারকারী ভেবে নিয়েছিলেন কেউ কেউ, ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের পর যেমনটি বলা হতো মান্নান ভূইঁয়ার ব্যাপারে। একদিকে সিনিয়র নেতাদের রক্তচক্ষু অন্যদিকে কারাবন্দি চেয়ারপারসনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করার পাশাপাশি রয়েছে লন্ডন সম্পর্ক চাঙ্গা রাখা আর দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মানসিকতা উপলব্ধি করা। এই টানাপোড়েনের মাঝেই ত্রিশংকূল অবস্থা এই মহাসচিবের। তাঁর এই করুণদশার আরো বড় প্রমান পাওয়া যায় জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের পর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তাঁর স্বভাবসুলভ বক্তব্যে বিএনপির নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘মির্জা ফখরুল একজন ভাল মানুষ, আপনারা তাঁর ওপর আস্থা রাখুন।’ ওইদিনের সমাবেশেও প্রিজন সেলে কারাবন্দি দলীয় নেত্রীর কথা বলতে গিয়ে কেঁদেছিলেন মির্জা ফখরুল। শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট ও মির্জা ফকরুলের ওপর আস্থা রেখে অভিভাবকহীন দলটি গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নেয়। ওই সময় থেকে শাসক শ্রেণী ও তাদের স্তাবকরা মির্জা ফখরুলকে রাজনীতির মাঠের তুখোর সট্রাইকার ভাবতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য কারিগর মনে মনে ভেবেছিলেন নিজের মতো করে। তাইতো নির্বাচনের দিনই নির্বাচন নিয়ে দেয়া এক বক্তব্যে দলের নেতা- কর্মীরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। নির্বাচনপূর্ব নানা কানাঘুষা ডালপালা মেলতে শুরু করে। শাসক আর তাদের দোসররা হাতে পায় এক মহামূল্যবান অস্ত্র। ক্ষত-বিক্ষত করে ফখরুল গংদের। আর ক্ষরণ হয় দলটি অগণিত তৃণমূল নেতা-কর্মীদের। দলের নানা স্তরের নেতা-কর্মীদের মাঝে জন্ম নেয় অসন্তোষ আর ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে অবিশ্বাস। এমন সংবাদ পরিকল্পিতভাবে চেপে যায় ফরমায়েশিরা। পরের দুই মাস চলে শপথ নাটক। স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্তের ১২ ঘন্টার মধ্যে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেন। নিলেন না ঠাকুরগাঁও-এ পরাজিত ও বগুড়ায় নির্বাচিত মির্জা ফখরুল। বলা হলো দলীয় কৌশল। কিন্তু পরদিন ‘ দলীয় কৌশল’ ব্যাখ্যা করতে এ সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিবের সাথে উপস্থিত ছিলেন না দলের কোন স্তরের একজন নেতাও। তা হলে কৌশলটা কি?. . . মজার বিষয় হলো মহাসচিবের শপথ না নেয়া আর বিএনপির এমপিদের শপথ নেয়াকে এক শ্রেণীর দলদাস ও প্রগতিবাদীরা উল্লাস প্রকাশ করতে থাকলো। তারা মির্জা ফখরুলকে কিংবদন্তি নেতা বানানোর প্রয়াস খুঁজছেন। শপথ নেয়াকে রাজনীতির ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর ২\৩ দিন আগে ফেনীর ইসরাত ঘটনায় এই প্রগতিবাদীরা কোন রা শব্দটি করেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন বেশ শক্তিশালী ক্ষেত্র বিশেষ। নানা প্রচার ও সামাজিক মাধ্যমে ওই সব প্রগতিবাদীরা কেন বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত ও মির্জা ফখরুলকে মহানায়ক বানাতে চাচ্ছে তা গবেষণার বিষয়। এখানে অসংখ্য ও যৌক্তিক কিছু প্রশ্ন সামনে এসে যায়। শপথ নেয়া যদি দলীয় কৌশল হয় তা হলে তা নিয়ে ডঃ কামাল হোসেন ছাড়া ঐক্য ফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেন? নির্বাচনের দিন বিএনপির দুই নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ ও মির্জা আব্বাস ভোট না দিয়ে কেন্দ্র থেকে ফেরত আসার পরও নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলা হলো কেন? নির্বাচনের পর ২০ দলীয় জোট নেতা ড.অলি আহমদ বিএনপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন তার ব্যাখ্যা বা জবাব কোন পক্ষ থেকেই দেয়া হচ্ছে না কেন?
এমন আরো অনেক জিজ্ঞাসা দলটির নেতা- কর্মীর। দলটিকে নিয়ে যারা গবেষণা করেন বা অতীতে করেছেন তাদের মতে, মির্জা ফখরুলকে সকল বিতর্কের উর্ধে উঠতে হবে। সকল স্তরের নেতা-কর্মীদের সাথে রাজনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। শীর্ষ নেতা- নেত্রীর কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছাতে হবে। গবেষক বা বিশেষজ্ঞদের মতে, তা হলেই বর্তমান শাসক শ্রেণীর হাত থেকে নিজেকে যেমন পরিছন্ন রাখতে পারবেন তেমনি সাবেক মহাসচিব ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদার, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া বা খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হবে এই শিক্ষক রাজনীতিবিদের। তবে পরামর্শ নিতে হবে রাজনৈতিক বিদগ্ধজনদের কাছ থেকেই। তবে আশার কথাও আছে, শাসক গোষ্ঠীও স্বস্তিতে নেই তার প্রমান নানা কসরত করে মাত্র চার এমপির শপথ গ্রহণ করানো। আর একটি দলকে নিয়ে এখনো মাতামাতি।

মাহমুদ হাসান : সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়াা]